হকার আর পার্কিংয়ের ফাঁদে চাতরী চৌমুহনী


চাতরী চৌমুহনী বাজার। আনোয়ারার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ভিড়, শত শত গাড়ির চলাচল। কোরিয়ান ইপিজেডের শ্রমিক থেকে শুরু করে স্কুলগামী শিশু, অফিসযাত্রী থেকে বাজারের ক্রেতা- সবাইকে পার হতে হয় এই একটি মোড়।

কিন্তু এই মোড় পার হওয়া এখন যেন একটা যুদ্ধ।

একদিকে সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে ধীরগতিতে, রাস্তা সরু হয়ে এসেছে। অন্যদিকে সেই সরু রাস্তার ওপরেই অটোরিকশা আর টমটম চালকেরা বানিয়ে নিয়েছেন অবৈধ স্ট্যান্ড। আর রাস্তার কিনারে ভাসমান কাঁচাবাজারের হকাররা দোকান বসিয়েছেন এমনভাবে যে পথচারীর হাঁটার জায়গাটুকুও নেই।

ফলাফল- প্রতিদিন তীব্র যানজট। প্রতিদিন মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট।

ঘড়ির কাঁটায় যানজটের হিসাব

চাতরী ইউনিয়নের বাসিন্দা সুকোমল দত্ত প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করেন। তার অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু চাতরী চৌমুহনী পার হতেই প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় নষ্ট হচ্ছে।

মাসে হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রায় ১০ ঘণ্টা। বছরে প্রায় ৫ দিন- শুধু একটি মোড় পার হতে।

তিনি বলছেন, “যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও হকারদের বিরুদ্ধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় দিন দিন এই ভোগান্তি আরও বাড়ছে। বিশেষ করে অফিস ও স্কুল-কলেজের সময়ে এই জটলা তীব্র আকার ধারণ করে।”

ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত

যানজটের শিকার শুধু পথচারী বা যাত্রীরাই নন। ক্ষতি হচ্ছে বাজারের ব্যবসায়ীদেরও।

আহমেদ ক্লথের স্বত্বাধিকারী মঈনুদ্দিন বাবর বলছেন, “রাস্তার ওপর হকাররা বসার কারণে ক্রেতারা দোকানে আসার সুযোগ পান না। তার ওপর সারাক্ষণ জটলা লেগে থাকায় বাজারের ব্যবসায়িক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।”

সড়কের ওপর হকার বসলে ক্রেতা আসতে পারেন না। ক্রেতা না এলে বিক্রি হয় না। বিক্রি না হলে ব্যবসা চলে না। একটি অবৈধ দখলের শিকলে আটকে যাচ্ছে পুরো বাজারের অর্থনীতি।

প্রশাসন বলছে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিন উদ্দীন জানিয়েছেন, সড়কের চলমান কাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারদের কঠোর তাগাদা দেওয়া হয়েছে। অবৈধ পার্কিং ও হকার উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযানও চলছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

কিন্তু স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন, অভিযান চললে দখল কমছে না কেন? নিয়মিত উচ্ছেদ হলে হকাররা ফিরে আসছেন কীভাবে? অভিযানের পরদিনই কি আবার ফিরে আসে পুরনো চিত্র?

এই প্রশ্নের উত্তর মেলে না। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে সমস্যার আসল গভীরতা।

সমস্যা একটি, কারণ অনেক

চাতরী চৌমুহনীর যানজট আসলে একটি সমস্যার নাম নয়। এটি কয়েকটি সংকটের একসাথে বিস্ফোরণ।

পিএবি প্রধান সড়কের ওপর বাজারের অবস্থান হওয়ায় এমনিতেই এখানে যানবাহনের চাপ বেশি। আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন রুটের হাজার হাজার গাড়ি প্রতিদিন এই পথে চলে। তার ওপর কোরিয়ান ইপিজেডের শ্রমিকদের যাতায়াতের চাপ তো আছেই। এই স্বাভাবিক চাপের মধ্যে সড়কের একপাশে উন্নয়নকাজ চলায় রাস্তা আরও সরু হয়ে গেছে। সেই সরু রাস্তায় অবৈধ স্ট্যান্ড আর হকারের দখল মিলে তৈরি হয়েছে যানজটের এই বিষফোঁড়া।

যা চাইছেন স্থানীয়রা

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের দাবি স্পষ্ট- সড়কের উন্নয়নকাজ দ্রুত শেষ করতে হবে, অবৈধ পার্কিং বন্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং হকারদের জন্য বাজারের বাইরে নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে।

কিন্তু তাৎক্ষণিক অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা- নির্দিষ্ট অটোরিকশা স্ট্যান্ড, হকারদের জন্য পুনর্বাসন এবং সড়কের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার জবাবদিহি।

আনোয়ারা এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। কর্ণফুলী টানেল, কোরিয়ান ইপিজেড আর আসন্ন মহাসড়কের কারণে এই উপজেলার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এই গুরুত্বের সাথে তাল মিলিয়ে যদি চাতরী চৌমুহনীর মতো প্রধান বাণিজ্যিক মোড়গুলো সচল না থাকে, তাহলে উন্নয়নের পুরো সুফলটাই ম্লান হয়ে যাবে।