
একসময় তাঁর নামেই কাঁপত পুলিশ বাহিনী। র্যাবের মহাপরিচালক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, শেষমেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদ- আইজিপি। রাষ্ট্রের এই বিশাল ক্ষমতার আসনে বসে বেনজীর আহমেদ গড়ে তুলেছিলেন এক সমান্তরাল সাম্রাজ্য। সেই সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল ভয়, জমি দখল, অর্থ পাচার আর ক্ষমতার নির্লজ্জ অপব্যবহার।
কিন্তু সাম্রাজ্যের পতন হয়। বেনজীরেরও হলো।
গত ১২ জুন দুবাইয়ে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে পলাতক এই সাবেক আইজিপিকে। রোববার সংসদে এই খবর জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
ক্ষমতার শীর্ষে বসে যা করেছিলেন
১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন বেনজীর আহমেদ। ধাপে ধাপে উঠেছেন ওপরে। ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক। এরপর ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি।
এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি যা অর্জন করেছেন, তার হিসাব করতে বসলে চমকে যেতে হয়।
গোপালগঞ্জের বৈরাগীটোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমিতে গড়েছিলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে কয়েক শ বিঘা জমি কিনেছিলেন নিজের ও পরিবারের নামে। এসব জমির প্রায় সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। সেই মানুষগুলো বলছেন, ভয় দেখিয়ে, জোর করে, নানা কৌশলে তাঁদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিক্রি ছাড়া তাঁদের কোনো উপায় ছিল না।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২৪ কাঠা জায়গায় বাড়ি। ঢাকার গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট। ৩৩টি ব্যাংক হিসাব। ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার। ৩টি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট। ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র।
দুদকের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, শুধু বেনজীর নয়, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েও অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ। বড় মেয়ে ফারহীনের নামে ৮ কোটি ৭৫ লাখ, মেজ মেয়ে তাহসীনের নামে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ। সব মিলিয়ে পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ।
হত্যা থেকে গুম, মামলার সারি দীর্ঘ
সম্পদের অভিযোগ ছাড়াও বেনজীরের বিরুদ্ধে আছে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা।
২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলার আসামি তিনি। সেই সময় তিনি ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার।
র্যাবের টিএফআই সেলে মানুষ গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও আসামি বেনজীর। এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন, যাদের মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা।
এর বাইরে আছে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জমি দখল, অর্থ পাচার এবং পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা।
ভুয়া ডিগ্রি, জাল পাসপোর্ট
বেনজীরের কীর্তির তালিকা আরো দীর্ঘ।
২০১৯ সালে আইজিপি থাকাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন তিনি। এরপর থেকে নামের আগে লিখতেন ‘ডক্টর’। কিন্তু ওই প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতাই তাঁর ছিল না। শর্ত শিথিল করে তাঁকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই ডিগ্রি স্থগিত করে।
পাসপোর্টের গল্পটাও কম অবাক করার নয়। ২০১৬ সালে র্যাবের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় সরকারি চাকরির তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেন। পাসপোর্ট অধিদপ্তর আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু র্যাব সদর দপ্তর থেকে চিঠি আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় তাঁর বাসায় গিয়ে।
নিষেধাজ্ঞা, পলায়ন, গ্রেপ্তার
২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন বেনজীরও। অদ্ভুতভাবে সেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ২০২২ সালে জাতিসংঘের পুলিশপ্রধান সম্মেলনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকার থাকতেই বেনজীরের দুর্নীতির খবর উঠতে শুরু করে। ২০২৪ সালের ৪ মে দুদকের তদন্ত শুরু হতেই দেশ ছাড়েন তিনি। তিন মাসের মধ্যে ৫ আগস্ট সরকার পতন। তদন্তে গতি আসে। মামলার পর মামলা। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ।
আর ১২ জুন দুবাইয়ে গ্রেপ্তার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বেনজীরকে শিগগিরই দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
অপেক্ষায় বিচার
বাংলাদেশের ইতিহাসে সাবেক পুলিশ প্রধানদের কেউ কেউ মামলা ও দণ্ডের মুখে পড়েছেন। কিন্তু এত বিচিত্র, এত বহুমাত্রিক অভিযোগ আর কারো বিরুদ্ধে ওঠেনি।
মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি, জমি দখল, অর্থ পাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতি, ভুয়া ডিগ্রি- প্রতিটি অভিযোগই গুরুতর। প্রতিটির জন্যই অপেক্ষা করছে বিচার।
দুবাইয়ের কারাগার থেকে দেশে ফেরার পর বেনজীর আহমেদের সামনে যে দীর্ঘ বিচারিক পথ অপেক্ষা করছে, সেটাই এখন দেশবাসীর প্রত্যাশার কেন্দ্রে।
