
সংবাদ প্রকাশের আগে পাঁচদিন আগেও অনলাইন পোর্টালে কিছুই ছিল না। আজ ভুক্তভোগী ডা. ওবায়দুল হক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন- রাতারাতি সব বদলে গেছে। আবেদন ‘নামঞ্জুর’। মন্তব্যে লেখা, শুনানি হয়েছে, বিবাদি অনুপস্থিত।
অথচ ভুক্তভোগীর অভিযোগ- আড়াই বছরে মিস মামলার একটিবারও শুনানি হয়নি, আর দেড় বছর ধরে ঝুলে থাকা নামজারি মামলারও কোনো শুনানি না করেই অনলাইনে ভুয়া শুনানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে!
একুশে পত্রিকায় ‘পেন্সিলের দাগে আটকে আড়াই বছর, বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো ধমক খেলেন চিকিৎসক!’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছেন আনোয়ারার সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরা। তবে প্রতিকার দিতে নয়- নিজের গাফিলতি ঢাকতে সরকারি অনলাইন পোর্টালে পেছনের তারিখ দিয়ে দেড় বছর ধরে আটকে থাকা নামজারি মামলার ভুয়া শুনানির রেকর্ড ঢুকিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ভূমি অফিসের একটি পেন্সিল দাগের অজুহাতে আড়াই বছর আগের মিস মামলাটি নিষ্পত্তি না করে, সেটির দোহাই দিয়ে দেড় বছর ধরে যে নামজারি আবেদনটি আটকে রাখা হয়েছিল, সেই মামলা এখন নতুন রূপ নিয়েছে- ব্যাকডেটেড মন্তব্য যুক্তের অভিযোগে।
যেভাবে শুরু
২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর। চিকিৎসক ডা. ওবায়দুল হক তাঁর দুই সন্তান মোহাম্মদ ওয়াদিদ আযলান এবং মো. ওমাইদ আযোয়ান ওয়াফির নামে জমির নামজারির আবেদন করলেন। আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ মৌজার ৪৪৩৯ খতিয়ানের ৩২৫৪ দাগের জমি। আবেদন নম্বর ৭৮১২৪৪২। সেদিনই বিকাশে ৭০ টাকা ফি দেওয়া হলো।
সব ঠিকঠাক। কাগজপত্র জমা দেওয়া হলো। ফি পরিশোধ হলো। এখন শুধু অপেক্ষা।
অপেক্ষা শেষ হলো না। দিন গেল, সপ্তাহ গেল, মাস গেল। যোগাযোগ করা হলো। জানানো হলো- প্রতিপক্ষ ছালেহা বেগমের একটি মিস মামলা চলছে। সেটা সচল থাকায় নতুন ফাইল নেওয়া যাবে না।
কিন্তু সেই মিস মামলার শুনানি? কবে হবে? কেউ বলতে পারল না।
ভুক্তভোগীর প্রতিনিধি মোহাম্মদ নাছির সুলতান ভূমি অফিসে গেলেন। উত্তর মিলল না- বরং মিলল ধমক।
মিস মামলার আড়াই বছর আর নামজারির দেড় বছর এভাবেই বিনা শুনানিতে কাটল।
সংবাদ প্রকাশের পর যা হলো
একুশে পত্রিকায় ১১ জুন এই অনিয়মের খবর প্রকাশ পেল। তারপরই নড়েচড়ে বসলেন দীপক ত্রিপুরা। নিজেই বললেন ভুক্তভোগী ডা. ওবায়দুল হক যেন তার সাথে যোগাযোগ করলেন। এরপর ১৪ জুন ভুক্তভোগী ফোনে যোগাযোগ করলে অনলাইন কপিসহ কার্যালয়ে আসতে বললেন।
কিন্তু আজ সোমবার সকালে ডা. ওবায়দুল হক যখন ইন্টারনেটে তাঁর নামজারি আবেদনের অবস্থা দেখলেন, থমকে গেলেন।
অনলাইন পোর্টালে আবেদনটি ‘নামঞ্জুর হিসেবে গণ্য’ করা হয়েছে। মন্তব্যে লেখা- ‘অদ্য শুনানির জন্য তারিখ ধার্য আছে। বাদি শুনানির জন্য হাজির। বিবাদি অনুপস্থিত।’ মালিকানার স্বপক্ষে দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ডা. ওবায়দুলের দাবি- “মাত্র পাঁচদিন আগেও এই মন্তব্যের অস্তিত্বই ছিল না অনলাইনে। সংবাদ প্রকাশের পর পোর্টালে ব্যাকডেটেড মন্তব্য যুক্ত হয়েছে।”
অর্থাৎ দেড় বছর ধরে নামজারি মামলার যে শুনানি একবারও হয়নি, সংবাদ প্রকাশের পর রাতারাতি সেই শুনানির রেকর্ড তৈরি হয়ে গেল। পুরনো তারিখ দিয়ে।

প্রশ্নের মুখে নীরবতা
একুশে পত্রিকার এ প্রতিবেদক হোয়াটসঅ্যাপে এসিল্যান্ড দীপক ত্রিপুরাকে তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠালেন। আড়াই বছর আগের মিস মামলার দোহাই দিয়ে দেড় বছর ধরে নামজারি ফাইল গ্রহণ ও শুনানি না করে ঝুলিয়ে রাখা হলো কেন? আর নামজারি আবেদনে সংবাদ প্রকাশের পর রাতারাতি ব্যাকডেটে মন্তব্য যুক্ত হলো কীভাবে?
উত্তর এলো। কিন্তু প্রশ্নের জবাব এলো না। দীপক ত্রিপুরা লিখলেন, “আবেদনকারীকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উপজেলা ভূমি অফিসে আসতে বলা হয়েছিল এবং তিনি সরাসরি দেখা করে তার বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন।”
যে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার কোনো উত্তর নেই। যা ঘটেছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
উপর মহলেও ছিল নীরবতা
এই পুরো বিষয়টি আগেই চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকতকে জানানো হয়েছিল। তিনি নিশ্চুপ ছিলেন।
তবে সংবাদ প্রকাশের পর ভূমি ও পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বিষয়টি আমলে নিয়েছেন।
যে প্রশ্ন থেকে যায়
একটি পেন্সিলের দাগ। একটি মিস মামলার দোহাই। আড়াই ও দেড় বছরের ঘুরপাক। ধমক। হয়রানি।
আর যখন একুশে পত্রিকা আলো ফেলল, তখন রাতারাতি ডিজিটাল নথিতে পুরনো তারিখে নামজারি মামলার শুনানির রেকর্ড।
প্রশ্ন হলো- এই ব্যাকডেটেড মন্তব্য যুক্ত করার বিষয়টি সত্যি হলে তা কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়? সরকারি অনলাইন পোর্টালে মিথ্যা তথ্য ঢুকিয়ে দিলে, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কার?
ডা. ওবায়দুল হক শুধু তাঁর সন্তানদের নামে জমির নামজারি চেয়েছিলেন। দেড় বছর পরেও সেটা পাননি। পেয়েছেন ধমক, হয়রানি আর এখন ‘ব্যাকডেটেড মন্তব্য যুক্তের’ নতুন অভিজ্ঞতা।
এই একটি মামলার গল্পই বলে দেয়, দেশের ভূমি প্রশাসনে সাধারণ মানুষের কতটা নিরুপায় অবস্থা।
