যে মানুষের অস্তিত্বই নেই, তিনি হয়ে গেলেন বাংলাদেশের নাগরিক


খালেক মেম্বার বাড়ি। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের পশ্চিমপাড়া। মৃত আবু তাহেরের পরিবার এখানে থাকেন। দুই ছেলে- মনির আহম্মদ রিকশা চালান, খোরশেদ আলম বাজারে ডিম বেচেন। ছয় মেয়ের সবার বিয়ে হয়ে গেছে।

কিন্তু সরকারি কাগজপত্র বলছে অন্য কথা। সেই কাগজে আবু তাহেরের আরও একটি ছেলে আছেন- কামাল হোসেন। তিনি এই বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা। সোনাইমুড়ী পৌরসভার নাগরিক। ৫নং ওয়ার্ডের ভোটার।

আবু তাহেরের স্ত্রী রোকেয়া খাতুন বললেন, “কামাল হোসেন নামে আমার কোনো ছেলে নেই।” ছবি দেখানো হলো। তিনি বললেন, “এই মানুষটাকে আমি জীবনে কখনো দেখিনি।”

প্রতিবেশী ফেরদৌস বেগম, শাহাদাত হোসেন, মাহাবুবু আক্তার প্রমি- কেউই চেনেন না এই কামাল হোসেনকে। ছবি দেখেও চেনা গেল না।

কারণ কামাল হোসেন আসলে এই বাড়ির কেউ নন। তিনি একজন রোহিঙ্গা। পলাতক ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। আর সোনাইমুড়ী পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন অফিসের একটি অসাধু চক্রের সহায়তায় তিনি হয়ে গেছেন বাংলাদেশের নাগরিক।

একটি জন্ম সনদের অসম্ভব গল্প

কামাল হোসেনের ভোটার আবেদনের সাথে যুক্ত ছিল একটি জন্ম সনদ। সোনাইমুড়ী পৌরসভা থেকে দেওয়া। নিবন্ধন তারিখ ২০১৪ সালের ২৫ জুন।

কিন্তু সেই সনদে পৌর কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষরের তারিখ দেখলে চমকে যেতে হয়- ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর।

২০১৪ সালে নিবন্ধিত জন্ম সনদে স্বাক্ষর হলো পাঁচ বছর পরে। এই অসম্ভব ঘটনাটিই ঘটেছে কাগজে-কলমে।

সনদে তথ্য যাচাইকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন সোনাইমুড়ী পৌরসভার সেনেটারি ইন্সপেক্টর মো. শামসুল আলম। নিবন্ধক হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন তৎকালীন পৌর মেয়র মোঃ মোতাহের হোসেন।

শামসুল আলম এখনও পৌরসভায় একই পদে কর্মরত। তার স্বাক্ষরের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়ন ছাড়া জন্ম নিবন্ধন দেওয়ার কথা নয়। এরপর প্রতিবেদককে হোয়াটসঅ্যাপে সনদটি পাঠাতে বলেন।

মূল প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এলো না।

ভোটার তালিকায় ঢোকার পথ

কামাল হোসেনের ভোটার আবেদনের নথি ঘেঁটে বেরিয়ে এল আরও তথ্য।

তথ্য সংগ্রহ করেছেন ফাতেমা তুজ জোহরা (এনআইডির শেষ চার সংখ্যা ১৩৭৭)। শনাক্তকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন খুরশিদা বেগম (এনআইডির শেষ চার সংখ্যা ১১৫১)। সুপারভাইজার ছিলেন শেখ আহমদ ভূঁইয়া (এনআইডির শেষ চার সংখ্যা ৫৯৩১)।

আর সব তথ্য যাচাই করে স্বাক্ষর করেছেন তৎকালীন ৫নং ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি মো. জসিম উদ্দিন।

২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ইস্যু হয় কামাল হোসেনের স্মার্ট কার্ড। সেই সময় সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাচন অফিসের দায়িত্বে ছিলেন বিমলেন্দু কিশোর পাল, যিনি ২০১৯ সালের ৪ মার্চ থেকে ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। বর্তমানে তিনি চাটখিল উপজেলা নির্বাচন অফিসে কর্মরত।

ফোনে কথা হলে বিমলেন্দু কিশোর পাল বললেন, “চাকরিতে ঢোকার পর প্রায় তিন লাখ ভোটার করেছি। এই নির্দিষ্ট ভোটারের বিষয়টি মনে নেই।”

সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আবু তালেব জানালেন, সেই সময় তিনি এই উপজেলায় ছিলেন না। তবে কামাল হোসেনের আবেদনের বিপরীতে পৌরসভার জন্ম সনদ এবং তৎকালীন জনপ্রতিনিধির স্বাক্ষর রয়েছে বলে নিশ্চিত করলেন।

পলাতক আসামি, একাধিক মামলা

কামাল হোসেন শুধু ভুয়া পরিচয় নেওয়া রোহিঙ্গা নন, তিনি একজন ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামিও।

ঢাকার বনানী থানায় চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলায় আদালত থেকে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়া থানায় আছে সরকারি কর্মচারীর ছদ্মবেশ ধারণ, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাতের মামলা। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা এবং ময়মনসিংহের ভালুকা মডেল থানায়ও পৃথক দুটি ফৌজদারি মামলায় তার নাম রয়েছে।

এই পরিচয় আড়াল করতেই সোনাইমুড়ীতে বানানো হয়েছিল ভুয়া নাগরিকত্ব।

প্রশাসন বলছে তদন্ত হবে

সোনাইমুড়ী পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরিন আকতার বললেন, “যদি কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভোটার হয়ে থাকে, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তথ্য এখন সামনে। নথিপত্র আছে। সরেজমিনে প্রমাণ মিলেছে। চক্রের সদস্যদের নামও উঠে এসেছে।

এখন দেখার বিষয়- তদন্ত আসলেই হবে কিনা।