দশ বছরের অপেক্ষা শেষ, আনোয়ারায় এলো ৪১৮৯ কোটির চীনা শিল্প অঞ্চল


২০১৫ সাল। দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হলো। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরে ভিত্তিপ্রস্তর বসল। কিন্তু এরপর জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, বিদেশি ঋণের শর্ত চূড়ান্ত না হওয়া, কোভিডের ধাক্কা, আইনি প্যাঁচ- একের পর এক বাধায় ফাইল পড়ে রইল বছরের পর বছর।

দশ বছর পর সেই অপেক্ষার অবসান হলো আজ।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হলো। প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।

যে প্রকল্পের দিকে তাকিয়ে আছে আনোয়ারা

আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে উঠবে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। চীনা সরকারের ঋণসহায়তা আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।

লক্ষ্যমাত্রা বলছে, প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হবে অন্তত এক লাখ মানুষের।

শুধু কারখানা নয়, পুরো একটি শিল্পনগর গড়ে উঠবে- লিংক রোড, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস রেগুলেটিং স্টেশন, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন এবং বর্জ্য শোধনাগারসহ আধুনিক সব অবকাঠামো।

কৌশলগত অবস্থানই সবচেয়ে বড় শক্তি

বেজার যুগ্ম সচিব মুনির উজ্জামান বললেন এই প্রকল্পের আসল সুবিধার কথা, “চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলটি এমন এক কৌশলগত অবস্থানে তৈরি হচ্ছে, যা কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অত্যন্ত নিকটবর্তী। এই অবকাঠামোগত সুবিধা দেশি-বিদেশি বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগকারীদের ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করবে।”

তিনি আরও বললেন, তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পে বিপ্লব আসবে এই অঞ্চলের হাত ধরে।

পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যোগ করলেন, “প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরের ঠিক আগ মুহূর্তে এই প্রকল্পের অনুমোদন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি চীনের বেইজিংয়ের কাছে একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা দেবে, যা দুই দেশের জিটুজি সহযোগিতাকে আরও জোরদার করবে।”

আনোয়ারার সংসদ সদস্য যা বলছেন

চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বললেন, “আনোয়ারাবাসীর জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কর্ণফুলী টানেলের পর এই প্রকল্প আনোয়ারার অর্থনৈতিক চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেবে।”

স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আশাবাদী তিনি। তবে একটি প্রতিশ্রুতিও দিলেন, “প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের কোনো সমস্যা যেন না হয় এবং জমি অধিগ্রহণের সঠিক ক্ষতিপূরণ যেন সবাই সময়মতো পান, তা আমরা কঠোরভাবে তদারকি করব।”

ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত, তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করছেন

চট্টগ্রামের ইন্টারন্যাশনাল বিয়ারিং সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মো. ইলিয়াস মিয়া বললেন, “কর্ণফুলী টানেল চালু হওয়ার পর দক্ষিণ চট্টগ্রামে যে শিল্পায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদনের মাধ্যমে তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।” তিনি বললেন, এই অঞ্চলে সহযোগী শিল্পের বিকাশ ঘটবে, যা স্থানীয় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশাল সুযোগ।

কিন্তু উৎসাহের পাশাপাশি সতর্কতার কথাও এলো। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, “একনেকে এই মেগা প্রকল্পের অনুমোদন বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু অনুমোদনই যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা কঠিন হবে।”

দশ বছরের শিক্ষা

২০১৫ থেকে ২০২৫- এই দশ বছরে প্রকল্পটি কেন আটকে ছিল, সেই ইতিহাসটাও মনে রাখা দরকার। জমি অধিগ্রহণ, ঋণের শর্ত, আইনি জটিলতা, কোভিড- প্রতিটি ধাপে ধাপে হোঁচট খেয়েছে প্রকল্প।

এবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের উদ্যোগে আবার গতি এলো। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দফায় দফায় বৈঠক, কারিগরি পর্যালোচনা- সব মিলিয়ে একনেকের টেবিলে উঠল প্রকল্প। এবার অনুমোদনও মিলল।

কিন্তু অনুমোদন মানেই বাস্তবায়ন নয়- এই শিক্ষাটাও দশ বছর ধরে দিয়ে গেছে এই প্রকল্পের ইতিহাস।

আনোয়ারার মানুষ এখন প্রত্যাশায়। বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্রে নিজেদের নাম দেখতে চায় তারা। সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা, নির্ভর করছে বাস্তবায়নের গতি ও সদিচ্ছার ওপর।