সময়টা এখনো মেসির

কানসাস সিটির আকাশে সেদিন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না। ছিল এক কিংবদন্তির আরেকটি প্রত্যাবর্তন, ছিল সময়কে অস্বীকার করার এক মহাকাব্য, ছিল পৃথিবীর কোটি মানুষের বহুদিনের এক বিশ্বাসের পুনর্জন্ম।

বিশ্বকাপের মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। সবুজ ঘাসের ওপর আলো ঝলমলে স্টেডিয়াম, গ্যালারিতে প্রায় ৭৭ হাজার দর্শক। আকাশি-সাদা জার্সিতে মোড়া হাজারো মুখের ভিড়ে কেউ গান গাইছিল, কেউ পতাকা ওড়াচ্ছিল, কেউবা অপেক্ষা করছিল শুধু এক ঝলক দেখার জন্য।

আর মাঠে নামার আগে ছিল প্রশ্ন।

৩৮ বছর বয়স। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। সাম্প্রতিক পেশির চোট। শরীর কি আগের মতো সাড়া দেবে? তিনি কি শুরু থেকেই খেলবেন? আর খেললেও, সেই পুরোনো জাদু কি এখনো বাকি আছে?

৪৫ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে লিওনেল মেসি সব প্রশ্নকে তুচ্ছ করে দিলেন।

খেলার শুরুতেই দেখা গেল এক অচেনা দৃশ্য। নিজের অর্ধে নেমে বল কাড়ছেন, প্রতিপক্ষকে তাড়া করছেন, জায়গা তৈরি করছেন। কয়েক বছর ধরে যে মেসিকে আমরা শক্তি বাঁচিয়ে খেলতে দেখেছি, তিনি যেন হঠাৎ ফিরে গেছেন নিজের তরুণ বয়সে। আরও ক্ষুধার্ত, আরও তীক্ষ্ণ, আরও বিপজ্জনক।

পঞ্চম মিনিটেই বল জালে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু অফসাইডের পতাকা উঠে যায়। সেই বাতিল গোল যেন ভবিষ্যতের জন্য একটি ছোট্ট ইঙ্গিত ছিল—এর চেয়েও বড় কিছু আসছে।

১৭ মিনিটে এল সেই মুহূর্ত।

রদ্রিগো দি পলের পাস পেয়ে প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে বল নিয়ে এগোলেন মেসি। সামনে হঠাৎ খুলে গেল সবুজ এক করিডর। কয়েকটি দ্রুত স্পর্শ, তারপর বক্সের কিনারা থেকে বাঁ পায়ের শট।

আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান হাত ছুঁয়েছিলেন। কিন্তু থামাতে পারেননি।

বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামের গর্জন যেন কেবল একটি গোল উদ্‌যাপন করেনি। উদ্‌যাপন করেছে একটি বিশ্বাসকে।

এক মুহূর্তে কানসাস সিটি আর আমেরিকার কোনো শহর ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল বুয়েনস এইরেসের এক টুকরো অংশ। লা বোম্বোনেরা, এল মনুমেন্তাল আর কানসাস—সব একাকার হয়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয় গোলটি এল ঘণ্টাখানেক খেলার পর।

আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট ঠেকিয়ে ভুল জায়গায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন লুকা জিদান। অনেক খেলোয়াড় হয়তো তখনও পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারতেন না। কিন্তু মহাতারকারা অন্যরকম। তাঁরা বিশৃঙ্খলার মধ্যেও সুযোগের গন্ধ পান।

মেসি পেয়েছিলেন।

গোলও করলেন।

কিন্তু সেদিনের রাতকে স্মরণীয় করার জন্য আরও কিছু বাকি ছিল।

৭৭ মিনিটে বিশ্ব ফুটবল আবারও দেখল সেই পরিচিত দৃশ্য।

বক্সের বাইরে। সামনে কয়েকজন ডিফেন্ডার। এক ঝলক জায়গা। তারপর বাঁ পায়ের বাঁকানো শট।

বল নিচের কোণে গিয়ে জড়াল।

গোল।

হ্যাটট্রিক।

বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক।

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গিয়েছিল। তারপর বিস্ফোরিত হলো স্টেডিয়াম।

এই তিনটি গোল শুধু একটি ম্যাচের গল্প নয়।

এগুলো ইতিহাসের গল্প।

এগুলো এমন এক ফুটবলারের গল্প, যিনি নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে এসে বিশ্বকাপে ১৬তম গোল করলেন। মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড ছুঁয়ে বসলেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে গেলেন।

আর মাঠে নামার মধ্য দিয়েই হয়ে গেলেন ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার, যিনি ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন।

তবে সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল অনুভূতি।

প্রথম গোলের পর টেলিভিশন ক্যামেরা ধরা দেয় এক বিরল দৃশ্য—মেসির চোখে জল।

সেই জল কি আনন্দের?

নাকি শেষ বিশ্বকাপের শুরুতে দাঁড়িয়ে স্মৃতির ঢেউ?

হয়তো দুটোই।

একটা সময় ছিল, আর্জেন্টিনা মেসির কাঁধে ভর দিয়ে বাঁচতে চাইত। এখন দৃশ্যপট বদলেছে। স্কালোনির দল রক্ষণে সংগঠিত, মাঝমাঠে প্রাণবন্ত, আক্রমণে বৈচিত্র্যময়।

এখন মেসিকে আর একা পৃথিবী বহন করতে হয় না।

তাই হয়তো তিনি আরও মুক্ত।

আরও স্বচ্ছন্দ।

আরও ভয়ংকর।

ম্যাচের ৮০ মিনিটে কোচ তাঁকে তুলে নিলেন। পুরো স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়াল। হাজারো হাত একসঙ্গে তালি দিল। আকাশি-সাদা রঙে ভেসে যাওয়া কানসাস সিটির সেই রাতে মেসি ধীর পায়ে হাঁটলেন সাইডলাইনের দিকে।

কোনো নাটকীয়তা নেই।

কোনো অতিরঞ্জন নেই।

যেন তিনি জানেন—এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি।

যেন তিনি জানেন—শেষ কবিতার শুরুটা মাত্র হয়েছে।

যেন তিনি জানেন—

পৃথিবীটা এখনো তাঁরই।

আর আমরা এখনো সেই পৃথিবীতেই বাস করছি।