অপরাধের আলামত গোপন করতে শিশুটিকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে খুনীরা


কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার (নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার) পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নে নিখোঁজের দুইদিন পর আট বছর বয়সী এক শিশুর খুনের ঘটনায় থানায় অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার পর লাশ গুম করার অভিযোগে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।

মঙ্গলবার রাতে চকরিয়া থানায় তিনজন আসামির নামোল্লেখ করে নিহত শিশুর বাবা বাদি হয়ে মামলাটি রুজু করেছেন।

পুলিশ মামলার আগে ঘটনায় সরাসরি জড়িত তিনজনকে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থলের আশপাশ এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে। বুধবার (১৭ জুন) দুপুর বারোটায় তিন আসামিকে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ।

মামলার এজাহারনামীয় ও গ্রেফতারকৃত আসামিরা হলেন পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের মৃত দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ছৈয়দ হোসেন ওরফে মানিক ওরফে কাবিলা, আজিজুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম এবং মৃত জহির ইসলামের ছেলে মো. আরমান।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও নিহত শিশুর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুন বিকেল পাঁচটার দিকে শিশুটি বাড়ির পাশের এলাকায় খেলতে বের হয়। সন্ধ্যার পরও বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিনও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় এলাকাজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

পরে পরিবার সদস্য ও এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে থানা পুলিশ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করে। একপর্যায়ে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের সন্দেহের ভিত্তিতে কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়।

এ অবস্থায় আটক এক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ চরপাড়া এলাকার একটি ডোবা থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, স্থানীয় নুরানি মাদরাসার শিক্ষার্থী ওই শিশুকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করার পর জড়িত আসামিরা পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে পরে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে। মূলত অপরাধের আলামত গোপন এবং মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে ডোবার পানিতে ফেলে দেয়া হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

মরদেহ উদ্ধারে অংশ নেওয়া মাতামুহুরী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে শিশুর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে নিহত শিশুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। সেখানে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে রাতে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চকরিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নুর আলম মাছুম সিদ্দিকী বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে গ্রেপ্তার তিন আসামিকে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে হাজির করেন।

এসময় দুইজন আসামি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ঘটনায় জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে একজন আসামি জবানবন্দি দেননি।

মামলার অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনে স্বীকারোক্তি না দেওয়া ওই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হবে।

আলোচিত খুনের মামলাটির আইনগত ব্যবস্থা বিষয়ে চকরিয়া আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ এম. ওমর আলী বলেন, শিশুটিকে অপহরণের পর আসামিরা সংঘবদ্ধভাবে পাশবিক নির্যাতন করে, পরে হত্যা করেছে। এটি একটি জঘন্য নৃশংস ঘটনা।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় চকরিয়া থানায় দায়ের করা মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত) এবং দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

বিক্ষোভ ও মানববন্ধন

কক্সবাজারের চকরিয়ায় আট বছরের ওই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বুধবার (১৭ জুন) অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে হাজারো নারী-পুরুষ অংশ নেন এবং অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবি জানান।

দুপুরে পূর্ববড় ভেওলা ইউনিয়ন থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মিছিলটি প্রায় আট কিলোমিটার এলাকা প্রদক্ষিণ করে চকরিয়া থানার সামনে দিয়ে উপজেলা চৌকি আদালতের সড়কে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন বহন করে শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। কর্মসূচিতে স্থানীয় পথচারীরাও সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেন।

বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের কারণে কিছু সময়ের জন্য উপজেলা পরিষদ সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন চকরিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজবাহ উদ্দিন। তিনি বলেন, শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা হলো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

এ সময় চকরিয়া অ্যাডভোকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আলহাজ হাবিব উদ্দিন মিন্টু এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহিদুল ইসলাম বলেন, তারা এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা করেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ববড় ভেওলা ইউনিয়নের মাইজপাড়া এলাকার আট বছর বয়সী ওই শিশু গত ১৪ জুন বিকেলে বাড়ির পাশ থেকে নিখোঁজ হয়।

পরিবার ও স্থানীয়রা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান পাননি। পরে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে ইউনিয়নের ফজুমিয়াজির চর এলাকার একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশুটির মৃত্যুর পেছনে অপরাধমূলক ঘটনা থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং অভিযোগের সত্যতা জানতে তদন্ত চলছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।