
বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হয়ে গেছে। স্টেডিয়াম কাঁপছে, পতাকা উড়ছে, মেসি হ্যাটট্রিক করছেন। উন্মাদনার ঢেউ লাগছে চট্টগ্রাম থেকে বুয়েনস আয়ার্স পর্যন্ত।
কিন্তু এই উন্মাদনার মাঝেও আর্জেন্টিনার গ্যালারিতে আজও একটি চেয়ার খালি থাকে। ১০ নম্বর জার্সিটা কেউ ছোঁয় না। কারণ ওটা দিয়েগোর।
ফুটবল একটা খেলা। দিয়েগো ম্যারাডোনা আসার পর সেটা হয়ে গেল কবিতা, বিপ্লব আর বস্তির ছেলের স্বপ্ন দেখার অধিকার।
৫ ফুট ৫ ইঞ্চির এক দৈত্য। মাঠে নামলেই বোঝা যেত—এই লোকটা বাকিদের চেয়ে আলাদা। বলটা যেন তার পায়ের সঙ্গে আঠা দিয়ে লাগানো। প্রতিপক্ষের পাঁচজন ডিফেন্ডার এগিয়ে আসত, দিয়েগো হাসতেন। তার ড্রিবলিং দেখে মনে হতো, বলটা অভিমান করে বারবার তার কাছেই ফিরে আসছে।
১৯৮৬, মেক্সিকো। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চার মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল। একটি ‘ঈশ্বরের হাত’, আরেকটি ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। একই ম্যাচে মানুষ আর ঈশ্বর—দুই দিয়েগোকেই দেখেছিল পৃথিবী। সাতজনকে কাটিয়ে গোলটি করার পর ধারাভাষ্যকার চিৎকার করে বলেছিলেন, “You have to say this is a genius goal!”
আর্জেন্টিনার জন্য তিনি বিশ্বকাপ এনেছিলেন। আর নেপলসের জন্য এনেছিলেন সম্মান। ইতালির ধনী উত্তর বনাম দরিদ্র দক্ষিণের লড়াইয়ে নাপোলি ছিল হাসির পাত্র। দিয়েগো এলেন, আর দুইবার সিরি আ জেতালেন। নেপলসের বস্তির ছেলেরা বলত, “ম্যারাডোনা আসার আগে আমরা মানুষ ছিলাম না। নাপোলি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছি।”
তিনি শুধু গোল করেননি, তিনি দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন।
দিয়েগোর জীবন সাদা-কালো ছিল না। মাদক, বিতর্ক, পতন—সবই ছিল। কিন্তু মানুষ তাকে বারবার ক্ষমা করে দিয়েছে। কারণ মাঠের বাইরের দিয়েগো যতই ভাঙাচোরা হোক, মাঠের ভেতরের দিয়েগো ছিল নিখুঁত শিল্প।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন—প্রতিভা উচ্চতা দেখে না, পাসপোর্ট দেখে না, ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে না। বস্তি থেকে উঠে আসা একটি ছেলে চাইলে গোটা পৃথিবীকে নাচাতে পারে।
তিনি নেই, কিন্তু আছেন সবখানে
মেক্সিকো ’৮৬ দেখেনি যে প্রজন্ম, তারা ইউটিউবে দেখে। ৬০ গজ দৌড়ে পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল—ভিডিওটা দেখার পর তারা ফিসফিস করে বলে, “মানুষ এভাবে পারে?”
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রতিটি ড্রিবলে, প্রতিটি বাঁ পায়ের ফ্রি-কিকে দিয়েগো ফিরে আসেন। মেসি যখন বল পায়ে নেন, পুরো পৃথিবী তিন সেকেন্ডের জন্য থমকে যায়। ওই তিন সেকেন্ডটা দিয়েগোর দেওয়া উপহার। তিনি শিখিয়ে গেছেন—ফুটবল শুধু জেতার খেলা নয়, মানুষকে স্বপ্ন দেখানোরও খেলা।
নেপলস থেকে নরসিংদী—একই কান্না
১৯৮৬ সালে নেপলসের বস্তির ছেলেটা যেমন টিভির সামনে কেঁদেছিল, ২০২৬ সালে চট্টগ্রামের চায়ের দোকানের ছেলেটাও তেমনই কাঁদে। দিয়েগো প্রমাণ করেছিলেন—দরিদ্রের ছেলেরাও রাজা হতে পারে। পাসপোর্টের রং, পকেটের টাকা—কিছুই লাগে না। লাগে শুধু একটা জ্বলন্ত বুক আর বাঁ পায়ের জাদু।
তাই বিশ্বকাপের এই উন্মাদনায় যখন “আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা!” স্লোগান ওঠে, তার মধ্যে মিশে থাকে আরেকটি নাম—“দিয়েগো! দিয়েগো!”
শেষ চিঠিটা লেখা হলো না
দিয়েগো ২০২৬-এর বিশ্বকাপ দেখে যেতে পারেননি। ২০২৬-এর স্টেডিয়ামে বসে চিৎকার করতে পারেননি। কিন্তু তিনি জানতেন—আর্জেন্টিনা আবার ফিরবে। আবার লড়বে। আবার ১০ নম্বর জার্সিটা গোটা দুনিয়াকে পাগল করবে।
মেসি আজ হ্যাটট্রিক করে ক্লোসাকে ছুঁয়েছেন। সেলিব্রেশনের পর তিনি আকাশের দিকে তাকান। ঠোঁট নাড়েন। লিপ-রিডাররা বলেন, তিনি যেন বলছেন, “এটা তোমার জন্য, দিয়েগো।”
উন্মাদনার মাঝে এক মুহূর্তের নীরবতা।
হ্যাঁ, ২০২৬ বিশ্বকাপ আমাদের। গোলের, উৎসবের, রেকর্ড ভাঙার। কিন্তু প্রতিটি উৎসবের শুরুতে এক মুহূর্তের নীরবতা রাখুন। ওই নীরবতাটা দিয়েগোর জন্য।
কারণ ফুটবলের ঈশ্বর মারা যান না। তিনি শুধু মাঠ ছেড়ে গ্যালারিতে গিয়ে বসেন। আর বসে বসে দেখেন—তার শেখানো জাদুটা নতুন প্রজন্ম কেমন করে করছে।
দিয়েগো, তুমি যেখানেই থাকো—২০২৬-এর এই উন্মাদনা তোমাকে ছাড়া অপূর্ণ।
২০২০ সালে যেদিন তিনি চলে গেলেন, সেদিন নেপলসের দেয়ালে দেয়ালে লেখা উঠেছিল—“Dio è morto”। ঈশ্বর মারা গেছেন।
আসলে কিন্তু ম্যারাডোনা মারা যাননি। তিনি এখনও বেঁচে আছেন—প্রতিটি বাঁ পায়ের ড্রিবলে, প্রতিটি দরিদ্র শিশুর স্বপ্নে, প্রতিটি গোল আর উল্লাসে।
২০২৬-এর গ্যালারিতে আজও একটি চেয়ার খালি। দিয়েগো ম্যারাডোনার জন্যই খালি।
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।
