সিঙ্গাপুর-দুবাইয়ের স্বপ্ন এবার আনোয়ারায়

কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে ছুটে যায় টানেল। পাশেই বিশাল সমুদ্রবন্দরের হাতছানি। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আনোয়ারা আজ স্বপ্ন দেখছে এক নতুন পরিচয়ের- বাংলাদেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল।

সিঙ্গাপুর কিংবা দুবাইয়ের মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের কথা শুনলে যে চিত্র চোখে ভাসে- চকচকে কারখানা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি, ঝামেলাহীন কাস্টমস, বিদেশি বিনিয়োগের জোয়ার- সেই একই স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ নিতে চলেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়।

স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির রূপরেখা

এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলকে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর হিসেবে। শিল্পকারখানার জন্য থাকবে আলাদা ডেডিকেটেড সাব-স্টেশন ও রিজার্ভার, যাতে বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির সংযোগ কখনো বিঘ্নিত না হয়।

পরিবেশের কথা ভুলে যায়নি পরিকল্পনাকারীরা। বসছে সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট- বিশ্বমানের বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা, যা নিশ্চিত করবে গ্রিন ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ।

কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্যের জন্য তৈরি হবে স্বয়ংক্রিয় কোল্ড স্টোরেজ এবং আধুনিক ওয়্যারহাউস। আর জোনের ভেতরেই থাকবে ওয়ান-স্টপ কাস্টমস স্টেশন- আমদানি-রপ্তানির ফাইল ছাড় করতে আর বাড়তি দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে না।

যোগাযোগে যে সুবিধা কেউ পায়নি আগে

কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে এই জোন সরাসরি যুক্ত হবে চট্টগ্রাম শহর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে পণ্য আসা-যাওয়া হবে সহজ।

চট্টগ্রাম বন্দর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গেও থাকবে সরাসরি সড়ক সংযোগ। বড় মাদার ভেসেল থেকে সরাসরি কাঁচামাল নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের সংযোগ এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের যাতায়াতও হবে নির্বিঘ্ন।

স্থলপথ, জলপথ, রেলপথ, আকাশপথ- চারটি মাধ্যমেই আনোয়ারার এই সংযোগ অভাবনীয়।

বিনিয়োগকারীদের জন্য লোভনীয় প্রস্তাব

সরকার ঘোষণা করতে যাচ্ছে একগুচ্ছ বিশেষ সুবিধা। কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানিতে থাকবে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা। বিনিয়োগের প্রথম কয়েক বছর আয়করে শতভাগ মওকুফ, পরের বছরগুলোতে ক্রমান্বয়ে কর ছাড়।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চাইলে একক মালিকানায় ব্যবসা চালাতে পারবেন। অর্জিত মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আইনি নিশ্চয়তাও থাকবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট- সব মিলবে একটি মাত্র জানালা থেকে, কয়েক দিনের মধ্যেই।

অর্থনীতির গেম চেইঞ্জার হতে পারে এই জোন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিঙ্গাপুর, দুবাই বা মালয়েশিয়ার মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের আদলে এই জোন পরিচালিত হলে বাংলাদেশের জিডিপিতে যুক্ত হবে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি। শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমে ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল, হালকা প্রকৌশল ও কেমিক্যাল শিল্পের মতো উচ্চ প্রযুক্তির খাতে দরজা খুলে যাবে।

স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিক্রিয়া

চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম এই অনুমোদনকে স্বাগত জানিয়েছেন উচ্ছ্বসিত ভাষায়।

তিনি বলেন, “আনোয়ারায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার এই ঐতিহাসিক অনুমোদন পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম তো বটেই, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে। এখন আন্তর্জাতিক মানের এই ফ্রি ট্রেড জোন গড়ে উঠলে আনোয়ারা প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রাজধানীতে পরিণত হবে।”

স্থানীয় তরুণদের নিয়ে তাঁর পরিকল্পনাও স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে এখানকার স্থানীয় যুবসমাজকে কারিগরি ও আইটি খাতে দক্ষ করে তোলা, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মানের এসব কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ পায়।”

স্থানীয়রা যেন বৈষম্য বা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সার্বিক তদারকির অঙ্গীকারও করেছেন তিনি।

স্বপ্ন বড়, প্রত্যাশাও বড়

কর্ণফুলী টানেল ও প্রস্তাবিত শিল্প অবকাঠামোকে ঘিরে আনোয়ারার এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে- এই আশাবাদ এখন সংসদ সদস্যের কণ্ঠে, ব্যবসায়ীদের আলোচনায়, অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে।

তবে স্বপ্ন যত বড়ই হোক, বাস্তবায়নের গতি আর সততাই নির্ধারণ করবে আনোয়ারা সত্যিই সিঙ্গাপুর-দুবাইয়ের পথে হাঁটতে পারবে কিনা।