পাঁচ বছরের জায়হানকে হাতুড়িপেটা করে খুন, মুক্তিপণের চিরকুট ছিল শুধুই নাটক


মঙ্গলবার দুপুর। বাড়ির সামনেই খেলছিল পাঁচ বছরের শিশু মো. জায়হান। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ নিখোঁজ। পুকুরে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কিন্তু এক ঘণ্টা পর বাড়ির একটি কক্ষে মেলে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির এক রহস্যময় চিরকুট। শুরু হয় পুলিশের অনুসন্ধান। ৩৬ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভোরে মেলে শিশু জায়হানের বস্তাবন্দী লাশ।

চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসদরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বপাড়া এলাকার এই মর্মান্তিক ঘটনার আদ্যোপান্ত উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ। বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মুক্তিপণের ওই চিরকুট ছিল স্রেফ একটি নাটক। মূলত প্রতিবেশী চাচাকে ফাঁসাতে এবং নিজেদের অপরাধ আড়াল করতেই এই নিখুঁত ছক কষা হয়।

এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত প্রতিবেশী সাদিয়া সুলতানা নিহা এবং তাকে সহযোগিতা করার অভিযোগে তার বাবা মো. সাইফুদ্দিন ও মা শাহানুর আক্তারকে আটক করেছে পুলিশ।

পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে আসে, নিখোঁজ হওয়ার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই শিশু জায়হানকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সাদিয়া সুলতানা নিহা একাই এই নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটায়।

জানা যায়, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে শিশু জায়হান ও সাদিয়া সুলতানা নিহা একসঙ্গে খেলছিল। খেলার ছলে জায়হানকে নিজেদের বাড়ির আঙিনায় নিয়ে যায় নিহা। সেখানেই ঘটে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড।

হত্যার পর লাশ গুম করতেও ঠান্ডা মাথার পরিচয় দেয় অভিযুক্তরা। প্রথমে একটি সিমেন্টের বস্তায় এবং পরে চালের বস্তায় ভরে রশি দিয়ে বেঁধে বাড়ির পেছনের একটি নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয় লাশ। এরপর গাছের ডাল দিয়ে সেটি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।

পটিয়া থানায় মঙ্গলবার রাতে মো. জায়হানের বাবার সাধারণ ডায়েরির (জিডি) পর পুরোদমে তদন্তে নামে পুলিশ। চিরকুটকে সূত্র ধরেই এগোয় পুলিশের কয়েকটি দল। পটিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জুয়েল উদ্দীন এই রহস্য উদ্‌ঘাটনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বুধবার সন্ধ্যার দিকে পুলিশ সাদিয়া সুলতানা নিহাকে নজরদারিতে আনে। পুলিশের জেরার মুখে একপর্যায়ে ভেঙে পড়ে সে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার ভোরে নর্দমা থেকে শিশু মো. জায়হানের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অপরাধ আড়াল করতে এবং প্রতিবেশী এক চাচাকে ফাঁসাতে সাদিয়া সুলতানা নিহা চিরকুটের নাটক সাজায়। পরে মো. সাইফুদ্দিন ও মা শাহানুর আক্তার বিষয়টি জেনেও মেয়েকে বাঁচাতে এই নাটকে সায় দেন এবং মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবার ভোরে শিশু মো. জায়হানের লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার শত শত মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল পটিয়া থানার সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। বিক্ষোভকারীরা আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।

পরে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বিক্ষোভকারীদের শান্ত করেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

ওসি জিয়াউল হক জানান, সাদিয়া সুলতানা নিহা শিশুটিকে হত্যার পর চিরকুটের নাটক সাজিয়েছিল। মেয়েকে বাঁচাতে তার বাবা-মাও এতে যুক্ত হন। জিজ্ঞাসাবাদে সাদিয়া সুলতানা নিহা হত্যার দায় স্বীকার করেছে এবং এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

পুরো ঘটনার বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, শিশুটির নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। দুই দিনের মাথায় রহস্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হলেও শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি। কারণ নিখোঁজ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম আরও জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে সাদিয়া সুলতানা নিহা কিছুটা একগুঁয়ে স্বভাবের। অতীতে মো. জায়হানের বাবা তাকে বকাঝকা করেছিলেন। সেই আক্রোশ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাদিয়া সুলতানা নিহা একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে লাশ গোপনের চেষ্টা করেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য তাকে আদালতে পাঠানো হবে।