
কক্সবাজার শহরের এক গলিতে বিকেলের নরম আলো পড়েছে। ছোট্ট একটি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কেকের ওপর শেষবারের মতো ক্রিমের নকশা আঁকছেন সুমি আক্তার। কয়েক মাস আগেও তিনি ছিলেন শুধুই একজন গৃহিণী। সংসারের খরচ বাড়ছিল, নিজের কিছু করার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন, জানতেন না।
আজ তিনি নিজের ফেসবুক পেজে কাস্টমাইজড কেক বিক্রি করেন। প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকা আয় করছেন। প্রথম অর্ডার হাতে পাওয়ার দিনটির কথা মনে পড়লে এখনও হাসি ফুটে ওঠে তাঁর মুখে।
“কেক বানানো শিখেছিলাম কান্তা আপার কাছ থেকে,” বলেন সুমি। “শুধু কেক নয়, তিনি আমাকে সাহস শিখিয়েছেন।”
এই ‘কান্তা আপা’ই জোবেদা আকতার কান্তা- চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের মেয়ে, যিনি আজ কক্সবাজারে শত শত নারীর কাছে পরিচিত এক অনুপ্রেরণার নাম।
চার দেয়ালের বাইরে আরেকটি পৃথিবী
বিয়ের পর স্বামী জাহাঙ্গীর আলম হেলালের চাকরির কারণে কক্সবাজারে চলে আসেন কান্তা। সায়মান বীচ রিসোর্ট ও সায়মান হেরিটেজ হোটেলের শীর্ষ পদে কর্মরত স্বামী, দুই সন্তান আর সমুদ্রঘেঁষা সংসার- সব মিলিয়ে জীবন ছিল ব্যস্ত।
কিন্তু ব্যস্ততা মানেই থেমে থাকা নয়।
চট্টগ্রাম কলেজ থেকে দর্শনে কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করা কান্তা বুঝেছিলেন, নিজেরও একটি পরিচয় দরকার। চাকরির পেছনে ছুটেননি। বরং ঘরের ভেতরেই খুঁজে নিয়েছেন সম্ভাবনার নতুন দরজা।
একটি ওভেন দিয়ে শুরু।
প্রথম দিকে অসংখ্য কেক নষ্ট হয়েছে। কখনও স্পঞ্জ বসে গেছে, কখনও ক্রিম ঠিকমতো হয়নি। অনেক রাত জেগে ইউটিউব দেখেছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, আবার ব্যর্থ হয়েছেন। তারপরও থামেননি।
ধীরে ধীরে সেই ছোট্ট শখই হয়ে উঠেছে পেশা।

যেখানে কেকের সঙ্গে শেখানো হয় ব্যবসাও
কক্সবাজারের বৌদ্ধ মন্দির রোডে, ফেমাস মার্কেটের বিপরীতে কান্তার ছোট্ট বেকিং স্টুডিও।
বাইরে থেকে সাধারণ একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র মনে হলেও ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়, এটি আসলে স্বপ্ন তৈরির কারখানা।
এখানে শুধু কেক বানানো শেখানো হয় না।
শেখানো হয় কীভাবে একটি শখকে ব্যবসায় রূপ দিতে হয়।
ভ্যানিলা ও চকলেট স্পঞ্জ, অথেনটিক রেড ভেলভেট, ব্ল্যাক ফরেস্ট, হোয়াইট ফরেস্ট, সুইসরোল, পাউন্ড কেক, কাপকেক- সবকিছু হাতে-কলমে শেখানো হয়। ক্রিমচিজ ফ্রস্টিং, আমেরিকান বাটারক্রিম, গানাশ, ড্রিপিং টেকনিক, প্যালেট নাইফের কাজ, নজেল ডিজাইন- একটি পেশাদার কেক তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই থাকে কোর্সে।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ শুরু হয় ক্লাসের শেষ দিকে।
কেকের দাম কীভাবে নির্ধারণ করবেন? কস্টিং করবেন কীভাবে? লাভের হিসাব? ডেলিভারি? বড় ব্যাচের কেক ভাগ করে বিক্রি? কাঁচামাল কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন?
কান্তা এসবও শেখান।
কারণ তাঁর বিশ্বাস, কেক বানানো শেখা আর ব্যবসা শেখা এক জিনিস নয়।
“কেক বানানো শিখলে একজন মেয়ে বেকার হয়, ব্যবসা শিখলে উদ্যোক্তা হয়”—বলছিলেন তিনি।
১০টি আসন, ১০টি নতুন সম্ভাবনা
আগামী জুলাইয়ে শুরু হচ্ছে ‘প্রফেশনাল বেসিক বেকিং-১, ব্যাচ-২৫’।
মাত্র তিন দিনের অফলাইন কোর্স।
অনেকেই অবাক হন, ব্যাচে মাত্র ১০ জন কেন?
কান্তার উত্তর সহজ।
“ভিড় করে ছবি তোলার জন্য নয়, শেখানোর জন্য ক্লাস করি।”
প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজ হাতে উপকরণ মাপেন, মিক্স করেন, বেক করেন এবং সাজান। শেষ দিনে নিজের বানানো কেক টিফিন বক্সে ভরে বাড়ি নিয়ে যান।
বাড়িতে সন্তানের মুখে যখন প্রথম সেই কেকের কামড় পড়ে, অনেকের কাছেই সেটিই হয়ে ওঠে জীবনের প্রথম অর্জনের স্বাদ।

কক্সবাজারের বাজারে নতুন সুযোগ
পর্যটনের শহর কক্সবাজারে প্রতিদিন জন্মদিন, বিয়ে, এনগেজমেন্ট, করপোরেট অনুষ্ঠান, পিকনিক কিংবা ছোট-বড় নানা আয়োজন লেগেই থাকে।
চাহিদা আছে, কিন্তু মানসম্মত ও কাস্টমাইজড হোমমেড কেকের সরবরাহ তুলনামূলক কম।
এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছেন কান্তার শিক্ষার্থীরা।
কেউ নিজের রান্নাঘর থেকে শুরু করছেন, কেউ ফেসবুক পেজ খুলছেন, কেউ পরিচিতদের মাধ্যমে প্রথম অর্ডার পাচ্ছেন।
মাত্র ৪ হাজার টাকার একটি কোর্স অনেকের জন্য হয়ে উঠছে নতুন আয়ের পথ।
কেউ মাসে পাঁচ হাজার টাকা আয় করছেন, কেউ দশ হাজার, কেউ আরও বেশি।
সংখ্যা হয়তো বড় নয়, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের মূল্য অনেক বেশি।
চট্টগ্রামের মেয়ে, কক্সবাজারের অনুপ্রেরণা
আজ কান্তা ২৫তম ব্যাচ পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এই পথচলায় সবচেয়ে বড় অর্জন কী?
প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকেন তিনি।
তারপর বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হলো, যখন দেখি আমার কোনো শিক্ষার্থী নিজের ব্যবসা শুরু করেছে। তখন মনে হয়, আমি শুধু কেক শেখাইনি, একটা পরিবারের জন্য নতুন দরজা খুলে দিতে পেরেছি।”
কক্সবাজারে এখন এমন অনেক নারী আছেন, যাদের পরিচয় আর শুধু কারও স্ত্রী বা কারও মা নয়।
তারা এখন ছোট ছোট কেক ব্যবসার মালিক।
তাদের হাতে তৈরি কেক যাচ্ছে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে, বিয়ের আয়োজনে, পর্যটকদের টেবিলে।
আর সেই গল্পগুলোর শুরু হয়েছিল একটি ছোট্ট ওভেন থেকে।
ওভেনে যেমন ধীরে ধীরে ফুলে ওঠে একটি কেক, তেমনি একটু সাহস, একটু প্রশিক্ষণ আর একটু দিকনির্দেশনা পেলে ফুলে ওঠে মানুষের স্বপ্নও।
চট্টগ্রামের মেয়ে জোবেদা আকতার কান্তা আজ কক্সবাজারে বসে সেই স্বপ্নগুলোই বেক করছেন- একটির পর একটি।
