
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি সদরে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় ও লাইসেন্স না থাকার অভিযোগে সিলগালা করা সেই ‘সেবা ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাব ইন’ আবার চালু করা হয়েছে। শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুরে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশেই এটির উদ্বোধন হয়।
ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ঋভুরাজ চক্রবর্তী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহম্মদ রশিদ চৌধুরী। এতে মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান স্বপন কুমার দত্ত এবং বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা মোবারক হোসেন কাঞ্চন প্রমুখ।
এর আগে, বুধবার কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিল, অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর প্রধান অতিথি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম উদ্বোধক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তৌহিদুল আলম প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে নানা সমালোচনা, বিতর্ক ও স্পর্শকাতরতা থাকায় এই অতিথিরা অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। তবে অপারগতার বিষয়ে তাঁরা ব্যক্তিগত নানা অজুহাত দেখালেও মূল কারণ ছিল ভিন্ন। এ নিয়ে পুরো সদরজুড়ে নানা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ আছে, ২০২৩ সালের ৪ জুলাই রাতে উপজেলার কাঞ্চননগরের জান্নাতুল মাওয়া রনি (২২) নামের এক প্রসূতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এই সেবাকেন্দ্রে উত্তেজনা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্বজনদের অভিযোগ ছিল, সিজারিয়ান অপারেশনের সময় ভুল চিকিৎসা ও অ্যানেসথেশিয়ার অতিরিক্ত ডোজ প্রয়োগের কারণে ওই প্রসূতির মৃত্যু হয়। নিহতের স্বামী রোমান উদ্দিনও সে সময় এমন অভিযোগ করেছিলেন এবং স্ত্রী হত্যার সুষ্ঠু বিচার চেয়েছিলেন।
সেদিন উত্তপ্ত খবরে ক্ষুব্ধ জনতা দায়ী চিকিৎসককে খুঁজতে সেবাকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীরা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে আত্মগোপনে যান। পরে ফটিকছড়ি থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ সময় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) সুদীপ্ত সরকার এবং তৎকালীন ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির রহমান সানি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরে তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ টি এম কামরুল ইসলাম অভিযান চালিয়ে লাইসেন্সসহ বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানাসহ সেবাকেন্দ্রটির সব কার্যক্রম বন্ধ করে সিলগালা করেন। তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ইউএইচও) আরেফিন আজিমও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, লাইসেন্সহীন ও মানহীন এই সেবাকেন্দ্র আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পুনরায় চালু করায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সদরের মতো এলাকায় এটি কীভাবে চালু হওয়া সম্ভব হলো, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সদরের বাসিন্দা নেজাম উদ্দিন বলেন, প্রসূতি মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনায় সিলগালা করা প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তে তাঁরা উদ্বিগ্ন। এমনটা হতে থাকলে ভবিষ্যতে এর চরম মূল্য দিতে হবে। এর মধ্য দিয়ে সাধারণের সেবার জায়গাটি সংকুচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হলো, যার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন বলেন, এ ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতি ও চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠেছে, যা রাষ্ট্রীয় আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধের শামিল।
জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান স্বপন কুমার দত্ত জানান, জাঁকজমকপূর্ণভাবেই উদ্বোধন হয়েছে। অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, ইউএনও এবং ইউএইচও থাকার কথা থাকলেও নানা কারণে তাঁরা আসেননি। নানা অসংগতি ও অনিয়মের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সব ঠিকঠাক করেই তাঁরা প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম জানান, পূর্বের কোনো বিষয় তাঁর জানা ছিল না। প্রতিষ্ঠানে কোনো অনিয়ম বা অভিযোগ পেলে তাঁরা তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
