
পাহাড়ের সবুজ ঢালে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছে। দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশির শব্দ, দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর খেলোয়াড়দের প্রাণবন্ত কণ্ঠ। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম যেন এক বিকেলে পরিণত হয়েছিল সম্প্রীতি, আনন্দ আর ফুটবল উন্মাদনার মিলনমেলায়। সেই উৎসবমুখর পরিবেশেই পর্দা উঠল দীঘিনালার ঐতিহ্যবাহী ৩১তম জোন কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬ এর।
শুক্রবার (১৯ জুন) বিকেল ৪টায় ২নং বোয়ালখালি ইউনিয়ন ও ১নং কবাখালী ইউনিয়নের মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত এই আসর। মাঠে ফুটবল গড়ানোর আগেই গ্যালারি ভরে যায় দর্শকে। পাহাড়ি-বাঙালি, তরুণ-প্রবীণ, নারী-পুরুষ—সবাই যেন একসঙ্গে হাজির হয়েছেন ফুটবলকে ঘিরে এক অনন্য মিলনমেলায়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দীঘিনালা জোনের জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-আমিন, এসইউপি, পিএসসি। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন জোনের উপঅধিনায়ক মেজর শিহাবুন সাকিব রূশাদ, পিএসসি, দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ, জোনের আরএমও, অ্যাডজুট্যান্ট, আনসার ও থানা প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
আয়োজকদের ভাষ্য, দীঘিনালা জোন প্রতিষ্ঠার পর থেকে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয়েছে এই ফুটবল টুর্নামেন্ট। এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে মোট ছয়টি দল।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-আমিন বলেন, “খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সম্প্রীতির অন্যতম সেতুবন্ধন। জোন কাপের মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় হবে। পাশাপাশি যুবসমাজ মাদক ও বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে থেকে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হবে।”
তিনি আরও বলেন, যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করতেই ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখবে দীঘিনালা জোন।
তবে উদ্বোধনী দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল মাঠের লড়াই। খেলার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয় ২নং বোয়ালখালি ইউনিয়ন। দর্শকদের করতালি আর উল্লাসের মধ্য দিয়ে একের পর এক গোল করে তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে ১নং কবাখালী ইউনিয়নকে ৪-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ের হাসি নিয়ে মাঠ ছাড়ে বোয়ালখালি ইউনিয়ন।
খেলাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামের প্রতিটি কোণ দর্শকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। শিশুদের উচ্ছ্বাস, তরুণদের স্লোগান, প্রবীণদের আগ্রহ—সব মিলিয়ে স্টেডিয়াম যেন পরিণত হয়েছিল এক প্রাণের উৎসবে।
দীঘিনালার মানুষের কাছে জোন কাপ কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; এটি পাহাড়ের মানুষের মিলন, সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতীক। আর সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ৩১তম আসরের যাত্রা শুরু হলো নতুন স্বপ্ন, নতুন উদ্দীপনা আর নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে। পাহাড়ের বুকজুড়ে এখন ফুটবলের উন্মাদনা—আর সেই উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দুতে দীঘিনালার জোন কাপ।
