
বিশ্বজুড়ে যখন সুইস ব্যাংকগুলোতে আমানত কমার ধারা চলছে, তখন একেবারে বিপরীত পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ- যার আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই উল্টো চিত্রই এখন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ পৌঁছেছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংকে। বর্তমান বিনিময় হারে (প্রতি ফ্র্যাংক ১৫২ টাকা) এই অঙ্কটা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার সমান- যা দেশের অন্তত ৩১টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সমপরিমাণ। ভাবা যায়, একটি দেশের এতগুলো ব্যাংক চালানোর সমান টাকা বিদেশের এক ব্যাংকে নিশ্চুপে শুয়ে আছে!
দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে চোখ রাখলে দেখা যাবে, এই অঙ্কে বাংলাদেশ এখন ভারতের পরেই দ্বিতীয় স্থানে। তবে কাদের নামে এই টাকা জমা আছে, তা জানার কোনো সুযোগ নেই- সুইস ব্যাংক তার আমানতকারীদের পরিচয় কখনোই প্রকাশ করে না। এই নীরবতাই বছরের পর বছর ধরে পাচারকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে রেখেছে।
পুরোটাই কি পাচার?
বাংলাদেশের আইনে কোনো নাগরিকের বিদেশে অর্থ জমা রাখার বৈধ পথ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশে টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই, এবং সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত কাউকে এমন বিশেষ অনুমোদনও দেওয়া হয়নি। কোনো প্রবাসীও সরকারকে জানায়নি যে তিনি সুইস ব্যাংকে অর্থ রেখেছেন। সবকিছু মিলিয়ে সহজ সিদ্ধান্তে আসা যায়- এই পুরো অর্থই দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হওয়া টাকা।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মইনুল ইসলামের পর্যবেক্ষণ, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পাচারের গতি কমেনি, বরং প্রবাসী আয়ের সুযোগ নিয়ে পাচারের পথ আরও সহজ হয়ে গেছে। তার মতে, একদিকে পাচার বন্ধ করা আর অন্যদিকে আগের পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনা- এই দুই ফ্রন্টেই কঠোর হতে হবে সরকারকে, নইলে এই চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানিয়েছেন, পাচার রোধ এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে আইনি সব পথেই কাজ চলছে, যদিও সুইস ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি কোনো সমঝোতা স্মারক এখনো হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা এগমন্ড গ্রুপের সঙ্গে এ বিষয়ে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা রয়েছে।
নির্বাচনের বছর আর পাচারের সম্পর্ক
বিশ্লেষকদের একটি পর্যবেক্ষণ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ- ২০২৫ সাল ছিল জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগের বছর, এবং ইতিহাস বলে, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও কালোটাকার মালিকরা সাধারণত অর্থ বিদেশে সরিয়ে রাখার চিন্তা করেন। এ বছরের আমানত বৃদ্ধির পেছনে এই শঙ্কাও একটি বড় কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সময়টায় অন্তর্বর্তী সরকার যখন আগের পাচার করা টাকা ফেরানোর জন্য নানা উদ্যোগ নিচ্ছিল, ঠিক তখনই নতুন করে এই বিপুল অর্থ পাচার হয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতির প্রতি রাষ্ট্রীয় সহনশীলতাই এই লাগামহীন পাচারের মূল কারণ।
গত এক দশকের চিত্র
বছর বছর হিসাব করলে দেখা যায়, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত সবসময় একই গতিতে চলেনি। ২০১৬ সালে এই আমানত ছিল ৬৬.১৯ কোটি সুইস ফ্র্যাংক, যা পরের বছর ২০১৭ সালে নেমে আসে ৪৮.১৩ কোটিতে। ২০১৮ সালে তা আবার বেড়ে হয় ৬১.৭৭ কোটি, এরপর ২০১৯ সালে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৬০.৩০ কোটি ফ্র্যাংকে। ২০২০ সালে আমানতের পরিমাণ আরও কমে ৫৬.২৯ কোটিতে নেমে এলেও ২০২১ সালে তা আকস্মিকভাবে লাফিয়ে উঠে পৌঁছায় ৮৭.১১ কোটি ফ্র্যাংকে- যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। তবে এই উচ্চতা স্থায়ী হয়নি; ২০২২ সালে আমানত একেবারে তলানিতে নেমে আসে মাত্র ৫.৫৩ কোটি ফ্র্যাংকে, আর ২০২৩ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় সর্বনিম্ন ১.৭৭ কোটি ফ্র্যাংকে। এরপর থেকেই শুরু হয় নতুন এক উল্লম্ফন- ২০২৪ সালে আমানত হঠাৎ বেড়ে হয় ৫৮.৯৫ কোটি ফ্র্যাংক, এবং সবশেষ ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে পৌঁছায় ৮৩.৪১ কোটি ফ্র্যাংকে।
২০২১ সালে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পর ২০২২-২৩ সালে আমানত প্রায় তলানিতে নেমে গিয়েছিল, কিন্তু এর পরের দুই বছরে তা আবার লাফিয়ে বেড়েছে- যা পাচারের প্রবণতায় একধরনের নতুন ঢেউয়ের আভাস দেয়। (উল্লেখ্য, স্বর্ণ, শিল্পকর্ম বা অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ এই আমানতের হিসাবের বাইরে থাকে।)
বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান
সুইস ব্যাংকে আমানতের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষস্থান এখনো যুক্তরাজ্যের দখলে- ২০২৫ সালে যাদের আমানত ১৮ হাজার ৩৯০ কোটি ফ্র্যাংক। তালিকায় পরের দিকে যুক্তরাষ্ট্র (৭,৩৬৫ কোটি), সিঙ্গাপুর (৩,১৫৭ কোটি), জাপান (৯৫৩ কোটি), চীন (১,০২৫ কোটি), রাশিয়া (৮৫৯ কোটি) এবং মালয়েশিয়া (২০৪ কোটি ফ্র্যাংক)। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আমানত এ বছর কিছুটা কমে ৩২৩ কোটি ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে, পাকিস্তানের ৩৮ কোটি এবং নেপালের ৩১ কোটি—বাকি দেশগুলোর আমানত লাখের ঘরই পার করতে পারেনি।
মজার বিষয় হলো, সারাবিশ্বে যখন সুইস ব্যাংকে মোট আমানত কমেছে- ২৫৬টি ব্যাংকে স্থিতি ৯৭ হাজার ৭১২ কোটি ফ্র্যাংক থেকে নেমে এসেছে ৮৯ হাজার ৬৩৮ কোটি ফ্র্যাংকে (৮ হাজার ৭৪ কোটি ফ্র্যাংক কমেছে)- তখন বাংলাদেশের আমানত বেড়েছে দেদারসে। এই বৈপরীত্যই আসলে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
টাকা পাচার হয় কীভাবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি চেনা পথেই দেশ থেকে বিদেশে টাকা সরে যায়:
– আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং— পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে বাড়তি টাকা বিদেশে রেখে দেওয়া
– রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং— পণ্যের দাম কম দেখিয়ে প্রকৃত আয়ের একটা অংশ দেশে না আনা
– হুন্ডি ও ভিওআইপি ব্যবসা— অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে টাকা আদান-প্রদান
– বিদেশে ঘুস লেনদেন— ডলারে সরাসরি দেশের বাইরে অর্থ লেনদেন
– লাগেজে ডলার পাচার— সরাসরি বিদেশযাত্রায় নগদ অর্থ বহন
পাচারের প্রকৃত মাত্রা: শ্বেতপত্রের ভয়াবহ হিসাব
দেশের আর্থিক খাতের সার্বিক চিত্র তুলে আনতে অন্তর্বর্তী সরকার যে শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করেছিল, সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে তৈরি সেই কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসা সংখ্যাটা রীতিমতো হতবাক করার মতো—আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার, স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৮ লাখ কোটি টাকা।
এই অঙ্কটা একটু থেমে ভাবার মতো:
– গড়ে প্রতি বছর পাচার হয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা
– এই পরিমাণ টাকা গত পাঁচ বছরের জাতীয় বাজেটের সমষ্টির চেয়েও বেশি
– এই অর্থ দিয়ে নির্মাণ করা যেত প্রায় ৭৮টি পদ্মা সেতু
প্রস্তাবিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে পাচারকৃত অর্থ ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
পরিসংখ্যান যা-ই বলুক, প্রশ্নটা থেকেই যায়- একটি দরিদ্র ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ থেকে এত বিপুল অর্থ কীভাবে নিয়মিত বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে, আর কেনই বা তা থামানো যাচ্ছে না? সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তা নীতি যেমন একটা বড় বাধা, তেমনি দেশের ভেতরের সুশাসনের ঘাটতিও কম দায়ী নয়। অর্থনীতিবিদরা একবাক্যে বলছেন, পাচার বন্ধ আর ফেরানো- এই দুই কাজ একসঙ্গে এগোলেই কেবল এই রক্তক্ষরণ বন্ধ হতে পারে। নইলে প্রতি বছর প্রকাশিত এই সংখ্যাগুলো শুধু আক্ষেপের নতুন নতুন রেকর্ড হয়েই থাকবে।
