
আজ ২০ জুন, বিশ্ব শরণার্থী দিবস। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত ও নিপীড়নে ঘরহারা মানুষের কথা স্মরণ করার দিন। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ঘেরা আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের কাছে দিনটি কোনো উৎসব নয়, কোনো নতুন প্রতিশ্রুতির দিনও নয়। বরং এই দিন এলে তাদের বুকের ভেতর জমে থাকা পুরোনো ক্ষতগুলো আবারও জেগে ওঠে।
কুতুপালং, বালুখালী, লম্বাশিয়া, মধুরছড়া, নয়াপাড়া, শালবাগান কিংবা জাদিমুরা—৩৩টি আশ্রয়শিবিরের প্রতিটি সরু গলি যেন একই গল্প বলে। বাঁশ-ত্রিপল আর টিনে ঘেরা অস্থায়ী ঘর। পাহাড়ের ঢালে গাদাগাদি করে থাকা মানুষ। বর্ষায় পাহাড়ধসের ভয়, শুষ্ক মৌসুমে আগুনের আতঙ্ক, আর প্রতিদিনের জীবনে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা।
এই শিবিরগুলোতে প্রায় এক দশক ধরে আটকে আছে লাখ লাখ রোহিঙ্গার জীবন।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে এখন কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে বাস করছে বিশাল এক জনগোষ্ঠী। ভাসানচরেও আছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। কাগজে-কলমে তারা শরণার্থী, বাস্তবে তারা অপেক্ষমাণ মানুষ—একটি নিরাপদ ফেরার পথের অপেক্ষায়।
কিন্তু সেই পথ এখনও খুলছে না।
কুতুপালং ক্যাম্প-৪-এর মাঝি মোহাম্মদ ইউনুসের কথায় সেই দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট। তিনি বলেন, “বিশ্ব শরণার্থী দিবস এলেই আমাদের জীবনের কষ্টগুলো নতুন করে সামনে আসে। প্রায় ৯ বছর ধরে আমরা বাংলাদেশে আশ্রিত জীবন কাটাচ্ছি। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু এটি আমাদের স্থায়ী সমাধান নয়। আমরা আমাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্বের অধিকার এবং সম্মানের সঙ্গে ফিরে যেতে চাই।”
এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে রোহিঙ্গা জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য—তারা সহায়তা চায়, কিন্তু ভিক্ষার জীবন নয়; তারা আশ্রয় পেয়েছে, কিন্তু ঘর পায়নি; তারা বেঁচে আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ পায়নি।
টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবিরের রহিমা খাতুনের দিন শুরু হয় হিসাব কষে। কতটুকু চাল আছে, ডাল কতদিন চলবে, শিশুর জন্য কিছু রাখা যাবে কি না—এসব ভাবতে ভাবতেই তাঁর সকাল পেরিয়ে যায়। খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ার পর সেই হিসাব আরও কঠিন হয়েছে।
রহিমা বলেন, “এই ডলারে কিছুই হয় না। মাসের অর্ধেক যেতেই চাল-ডাল শেষ হয়ে যায়। বাইরের কোনো কাজ করার সুযোগ নেই, নেই কোনো উপার্জনের পথ। এখন বিদেশ থেকে আত্মীয়রা টাকা পাঠালে কোনো পরিবার কোনোমতে দুবেলা খেতে পারে। বাকিদের অবস্থা বর্ণনাতীত।”
এই ‘বর্ণনাতীত’ শব্দটির ভেতর আছে ক্ষুধা, অপমান, অসহায়ত্ব এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার চাপ।
ক্যাম্পের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য শিশুদের জীবন। এখানে প্রায় ছয় লাখ শিশু-কিশোর বেড়ে উঠছে এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে তাদের জন্য নেই খেলার মাঠ, নেই পার্ক, নেই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার সুযোগ। অনেক শিশুর জন্মই হয়েছে ক্যাম্পে। তারা কখনও মিয়ানমার দেখেনি। তাদের কাছে ‘রাখাইন’ একটি গল্প, ‘মাতৃভূমি’ একটি শব্দ, আর ‘ফেরা’ একটি অপেক্ষা।
ঈদের দিনেও অনেক শিশুর ভাগ্যে নতুন জামা জোটে না। অপুষ্ট শরীর, ঘিঞ্জি ঘর, সীমিত শিক্ষা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে তাদের শৈশব আটকে আছে। তারা বোঝে না কেন তাদের মা-বাবা রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেন না; কেন বড়রা ফিরে যাওয়ার কথা বললেই চোখ ভিজে যায়।
আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ জুবাইর বলেন, “ক্যাম্পে আমাদের সন্তানরা বড় হচ্ছে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাধীন চলাচলের সুযোগ সীমিত। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মিয়ানমার দেখেনি। আমরা চাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আরও কার্যকর ভূমিকা নিক।”
যে শিশুরা জন্ম থেকেই শরণার্থী পরিচয়ে বড় হচ্ছে, তাদের সামনে ভবিষ্যতের দরজা কতটা খোলা—এই প্রশ্ন এখন ক্যাম্পের প্রতিটি পরিবারের।
উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের পাহাড়ি ঢালে থাকেন সাব্বির আহমদ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের সিকদার পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন তিনি। ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আসেন। তখন ভেবেছিলেন, কয়েক মাস পর হয়তো ফিরে যাবেন। সেই কয়েক মাস এখন প্রায় ৯ বছরে গড়িয়েছে।
সাব্বির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “৯ বছর পার হলো, কিন্তু ফিরে যাওয়ার কোনো পথ খুলল না। রাখাইনে এখন আর আগের পরিস্থিতিও নেই। জান্তার জায়গায় অনেক এলাকায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ। পরিস্থিতি আগের চেয়েও জটিল। সেখানে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ নাই।”
ফেরা তাই এখন শুধু একটি রাজনৈতিক শব্দ নয়; এটি এক গভীর ভয়, প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তার নাম।
রাখাইনে চলমান সংঘাত, নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে নির্যাতনের খবর ক্যাম্পের মানুষকে প্রতিদিন আতঙ্কিত করে। অনেকে বলেন, মিয়ানমারে ফিরতে চান, কিন্তু মরতে নয়। তাঁরা চান নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, অধিকার ও মর্যাদা।
কিন্তু যতদিন প্রত্যাবাসন আটকে আছে, ততদিন ক্যাম্পের ভেতরের জীবনও কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। তহবিল সংকটের কারণে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কর্মসূচিতে চাপ তৈরি হয়েছে। সহায়তা কমলে প্রথম আঘাত পড়ে শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ওপর। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করছে, অর্থের সংকট অব্যাহত থাকলে শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিবিরের ভেতরে আরেকটি ভয় ক্রমেই বড় হচ্ছে—নিরাপত্তাহীনতা। মাদকপাচার, মানবপাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা মাঝেমধ্যে সামনে আসে। কর্মসংস্থানহীন তরুণদের হতাশা অপরাধচক্রের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। কেউ কেউ দালালের প্রলোভনে পড়ছে, কেউ সশস্ত্র গোষ্ঠীর টানে জড়িয়ে পড়ছে, কেউ আবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে পাড়ি জমাতে চাইছে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার দিকে।
জীবনের অনিশ্চয়তা যখন দীর্ঘ হয়, তখন মৃত্যু-ঝুঁকিও অনেকের কাছে ছোট হয়ে যায়।
প্রতিবছর শত শত রোহিঙ্গা বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পেরিয়ে উন্নত জীবনের আশায় যাত্রা করে। কেউ পৌঁছায়, কেউ ফেরত আসে, কেউ হারিয়ে যায় সমুদ্রে। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমুদ্রযাত্রা ভয়াবহ প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। তবু স্রোত থামছে না। কারণ, ক্যাম্পে আটকে থাকা জীবন অনেকের কাছে আর জীবনের মতো মনে হয় না।
কুতুপালংয়ের আলমাস খাতুন ৯ বছর আগে স্বামী ও দুই ভাইকে হারিয়েছেন। তাঁর কথায় শরণার্থী জীবনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর আবেদন উঠে আসে। তিনি বলেন, “আমরা ভিক্ষা চাই না, আমরা আমাদের দেশ চাই। সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার চাই।”
এই একটি বাক্যই হয়তো বিশ্ব শরণার্থী দিবসের সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা।
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, রাখাইনের পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া রোহিঙ্গাদের সেখানে পাঠানো আত্মঘাতী হতে পারে। প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হলেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা ছাড়া সেই পথ বাস্তবসম্মত নয়।
চ্যালেঞ্জের মধ্যেও কিছু আশার আলো আছে। কুতুপালং ক্যাম্পে আধুনিক মাতৃসেবা হাসপাতাল চালু হয়েছে, যেখানে প্রসূতি মায়েদের জন্য ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এটি মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই সুবিধা এখনও সীমিত। অর্থায়ন সংকট থাকলে স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
বিশ্ব শরণার্থী দিবসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো তাই একসঙ্গে দুই ছবি তুলে ধরে। একদিকে বাংলাদেশ ও মানবিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় টিকে থাকা লাখো মানুষের জীবন; অন্যদিকে ঘরহারা মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা, ভয়, অপূর্ণ শৈশব ও অদেখা ভবিষ্যৎ।
শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুরা জানে না তাদের দেশ কোথায়। বৃদ্ধরা জানেন, কিন্তু সেখানে ফিরতে পারবেন কি না জানেন না। তরুণরা জানে, এখানে তাদের ভবিষ্যৎ আটকে আছে। মায়েরা জানেন, সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে—কিন্তু কীভাবে, সেই উত্তর প্রতিদিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
২০ জুন তাই কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়। এটি ঘরহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাসের দিন। এটি সেই প্রশ্নের দিন—একটি জাতিগোষ্ঠী আর কতদিন অপেক্ষা করবে?
রোহিঙ্গারা আজও একই কথা বলছে: তারা নিরাপদে ফিরতে চায়, নাগরিকত্ব নিয়ে ফিরতে চায়, মাথা উঁচু করে ফিরতে চায়। কারণ আশ্রয় জীবন বাঁচাতে পারে, কিন্তু মাতৃভূমির অভাব পূরণ করতে পারে না।
