
সকালটা শুরু হয়েছিল একটা ফলের চারা হাতে নিয়ে। মাটি খুঁড়ে যখন চারাটা বসানো হলো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, তখনই বোঝা গিয়েছিল- আজকের দিনটা অন্য দিনগুলোর মতো নয়। সোমবার (২২ জুন) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ যেন রূপ নিয়েছিল এক ছোট্ট উৎসবে- যেখানে একদিকে মাটির সঙ্গে মিশছে নতুন প্রাণের শিকড়, আর হলরুমের ভেতরে তর্কের আগুনে পুড়ছে যুক্তির খড়কুটো।
স্কাউট দলের সদস্যরা ফুল দিয়ে বরণ করে নিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে। তারপর তাঁরই হাতে রোপিত হলো প্রথম গাছটি- বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আনুষ্ঠানিকতা, কিন্তু গাছ লাগানোর সেই মুহূর্তে যে বার্তাটা ছড়িয়ে পড়ল, তা নিতান্তই আনুষ্ঠানিক ছিল না।
যখন তর্কের টেবিলে উঠল জলবায়ুর প্রশ্ন
দুপুরে হলরুম ভরে উঠল ছোট ছোট কণ্ঠের তীব্র যুক্তিতে। বিষয়- ‘জলবায়ু রক্ষায় জনগণের ভূমিকাই মুখ্য’। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ৩৬ জন শিক্ষার্থী ছয়টি ইভেন্টে নিজেদের যুক্তি, পাল্টা-যুক্তি আর উপস্থাপনার দক্ষতা মেলে ধরলেন। বিচারকের আসনে বসা নানুপুর নায়লা কবির কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ খালেদ সরোয়ার, মো. রবিউল হোসেন ও ফারজানা ইয়াসমিনের চোখে তখন মুগ্ধতা।
শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করল নবম শ্রেণির দল। তাসনিয়া তাবাস্সুম আনিসা, মাইশা ইসলাম, ফাইরোজ জান্নাত ইসরা ও ওয়াহিদা নেজাম ফারিহার যুক্তির জোরে চ্যাম্পিয়নের মুকুট গেল তাদের ঘরে। আর সপ্তম শ্রেণির জান্নাতুল ওয়াসিফা, নয়ন মণি, তাসনিম সিদ্দিকা তাসপিয়া ও আলিফা বিনতে ফয়েজ হলেন রানারআপ- বয়সে ছোট হলেও যুক্তির ধার কম ছিল না তাদের।

“একটি গাছ একটি প্রাণের মতো”
প্রধান অতিথির আসন থেকে ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম যখন বললেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, এই দায়িত্ব আমাদের সবার কাঁধে- তখন হলরুমে নেমে আসে এক অন্যরকম নীরবতা। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, প্রতিটি গাছ আসলে একটি প্রাণের সমান, আর আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে এখন থেকেই বেশি বেশি গাছ লাগানো জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আজকের এই বিতার্কিকেরাই একদিন দেশ গড়ার কারিগর হয়ে উঠবেন। বিতর্ক যে সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, জ্ঞান-চর্চার মাধ্যমে যে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব- সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি শিক্ষার্থীদের।

উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. আকরাম হোসেন বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, বিতর্ক শিক্ষার্থীদের মননশীলতা ও মেধার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখে, তাই এর চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সাংবাদিক আহমদ আলী চৌধুরীর কণ্ঠেও ফুটে উঠল আশাবাদ- এই দেশের তরুণেরা সৃজনশীল ও মেধাবী, তারাই দেশকে নিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে।
বিচারক মো. রবিউল হোসেন একটু অন্যভাবে দেখলেন পুরো আয়োজনকে। তাঁর কথায়, এটা স্রেফ একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতা নয়- পরিবেশ সচেতনতা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশ, এই সবকিছুর একটা মিলনস্থল।
দিনশেষে গান, নাচ আর কৃতজ্ঞতার আলো
বিচারকদের রায়ের পর মঞ্চে উঠলেন বিজয়ীরা, হাতে হাতে গেল পুরস্কার। কিন্তু উৎসব তখনও শেষ হয়নি। বিকেলের আলো নরম হতেই হলরুম রূপ নিল সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায়। গান, আবৃত্তি, নাচ- শিক্ষার্থীদের নানা পরিবেশনায় মুগ্ধ হলেন উপস্থিত অতিথিরা।
বিশেষ অতিথির আসনে বসে সাংবাদিক এস এম আক্কাছ, সোলাইমান আকাশ, মোহাম্মদ ইউসুফ আরফাত, মোহাম্মদ তৈয়ব, গিয়াস উদ্দীন ও মিন্টু কুমার রায়ও যোগ করলেন নিজেদের কিছু কথা। প্রধান শিক্ষক মো. একরাম উল্লাহর সভাপতিত্বে পরিচালিত এই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান শেষে আয়োজকেরা বললেন- এই উৎসব আসলে শিক্ষার্থীদের প্রাণে প্রাণেই মিলে গেছে।
বৃক্ষরোপণ, দেয়ালিকা উন্মোচন, তর্কের লড়াই আর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা মিলিয়ে দিনটি যেন প্রমাণ করে দিল একটা কথা-পরিবেশ বাঁচানোর শিক্ষা যদি ছোট থেকেই যুক্তি, সৃজনশীলতা আর উৎসবের ভেতর দিয়ে দেওয়া যায়, তবে তা মনে গেঁথে যায় অনেক বেশি গভীরভাবে। এসএসসি-৯৮ ব্যাচের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়- আগামীর জন্য একটি বার্তাও বটে।
