গোড়া আছে, গাছ নেই—টৈটংয়ের পাহাড়ে রক্ষকই যখন ভক্ষক


পাহাড়ে হাঁটলে এখন আর সবুজের ছায়া মেলে না। মেলে শুধু গাছের গোড়া—কাটা, পোড়া, কোথাও কোথাও উপড়ে ফেলা। একসময় কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া রেঞ্জের টৈটং ইউনিয়নের পাহাড়জুড়ে ছিল সেগুন আর গর্জনের ঘন বন। আজ সেই বনের নাম আছে কাগজে, বাস্তবে নেই গাছ। গোড়াগুলো যেন এক নীরব সাক্ষী—বলে দেয়, এখানে কিছু একটা ভয়াবহভাবে হারিয়ে গেছে।

আর এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনে যাদের দাঁড়ানোর কথা ছিল প্রাচীরের মতো, অভিযোগ উঠেছে তাদেরই কারও কারও বিরুদ্ধে—তারাই নাকি হয়ে উঠেছেন পাচারের সহযোগী।

ব্রিজের ওপর আটকা পড়া গাড়ি, তারপর যা ঘটল

রোববার। টৈটং ইউনিয়নের কেরুণ ছড়ি এলাকা। অবৈধভাবে কাটা বনজ গাছ বোঝাই একটি ট্রলি গাড়ি ছুটছিল লোকচক্ষুর আড়াল খুঁজে। কিন্তু হাসানের জুম ব্রিজের ওপর গাড়িটি আটকে দেন বন পাহারাদার সর্দার ফিরোজ। সঙ্গে সঙ্গে খবর যায় টৈটং বিট কর্মকর্তা মোতালেব আল মোমিনের কাছে।

ফিরোজের ভাষায়, বিট কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আসেন, গাড়িটি বিট অফিসে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেন। কিন্তু তারপর যা ঘটে, তা স্থানীয়দের চোখে রহস্যজনক—গাড়িটি জব্দ না হয়ে চলে যায় পাচারকারীদের কাছেই। ফিরোজ বলেন, তখন বিট কর্মকর্তার সঙ্গে ছিলেন কাশেম নামে একজন। পরে জানা যায়, গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রশ্নটা সহজ কিন্তু তীক্ষ্ণ—বন বিভাগের লোকজনই যদি পাচারকারীদের সহযোগিতা করেন, তাহলে পাহাড়ের বন রক্ষা হবে কীভাবে?

এই একটি ঘটনা যেন খুলে দিল একটা বড় বাক্সের ঢাকনা।

প্রতিদিনের পাচার, রাতের আঁধারে নিঃশব্দ মিছিল

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দিনের আলোয় আর রাতের অন্ধকারে—দুই সময়েই টমটম, ট্রলি আর সিএনজি বোঝাই হয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসছে কাঠ। পাহাড়ের গায়ে এখনো লেগে আছে সদ্য কাটা গাছের তাজা গোড়া, যেন প্রমাণ করে দিচ্ছে—এ কাজ থামেনি, বরং চলছে নিয়মিত। কার্যকর নজরদারি বা অভিযানের অভাবে পাচারকারীরা প্রায় নির্বিঘ্নেই সরিয়ে নিচ্ছে গাছ, আর প্রতিদিন একটু একটু করে খালি হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের সবুজ।

টাকার অঙ্কে বাঁধা সবুজ

অভিযোগের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ এখানেই। স্থানীয়দের দাবি, টৈটংয়ের অলী আহমদ ও কাশেম নামের দুই ব্যক্তিকে বিট কর্মকর্তা ব্যবহার করেন তাঁর অনানুষ্ঠানিক সহযোগী হিসেবে। তাঁদের মাধ্যমে চলে এক ধরনের ছায়া-হিসাব—নতুন বসতি স্থাপন, গাছ কাটা, বালু উত্তোলন, পাহাড় কাটা—সবকিছুর জন্যই যেন একটা নির্ধারিত দর আছে।

হিসাবটা শুনলে অবাক লাগে এর নিয়মতান্ত্রিকতায়—প্রতিটি টমটমের জন্য ২০০ টাকা, প্রতিটি ট্রলি গাড়ির জন্য ৪০০ টাকা, মাসোহারা হিসেবে। আর যারা এই অনিয়মের প্রতিবাদ করার সাহস দেখান, তাদের জন্য অপেক্ষা করে বন আইনে মামলার হুমকি। এলাকাবাসীর মতে, এই মাসোহারার নিয়মিত প্রবাহই কাঠ পাচারকে দিনে দিনে আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

শক্তের ভক্ত, নরমের যম

আরেকটি অভিযোগ আরও বেশি বিস্ময় জাগায়। টৈটং গর্জনিয়া পাড়ায় মো. করিম নামে এক ব্যক্তি সংরক্ষিত বনভূমিতে গড়ে তুলেছেন পাকা ভবন, কিন্তু বিট কর্মকর্তা সে বিষয়ে নেননি কোনো ব্যবস্থা। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও নতুন বসতি গড়ে উঠছে, পাহাড় কেটে তৈরি হচ্ছে রাস্তা, অথচ প্রভাবশালীদের ছোঁয়াও যায় না কোনো ব্যবস্থা। বিপরীতে অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—এই বৈপরীত্যকে এলাকাবাসী সংক্ষেপে বলছেন, ‘শক্তের ভক্ত, নরমের যম’।

কোথাও কোথাও আরও নির্মম দৃশ্য—গাছ কাটার পর প্রমাণ মুছে ফেলতে গোড়া উপড়ে ফেলা হচ্ছে, কিংবা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেন অপরাধটাই নয়, অপরাধের চিহ্নটাও মুছে ফেলতে হবে।

অস্বীকারের সুর

অভিযোগের জবাবে টৈটং বনবিট কর্মকর্তা মোতালেব আল মোমিন সরাসরি অস্বীকার করেছেন সব কিছু। তিনি বলেন, এমন কোনো গাড়ি তিনি আটক করেননি, তাই ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাঁর ভাষায়, পুরো অভিযোগই ভিত্তিহীন।

কিন্তু পাহাড়ে রয়ে যাওয়া শত শত গাছের গোড়া, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ আর স্থানীয়দের ক্রমাগত অভিযোগ—এসব মিলে একটা প্রশ্ন রেখে যায় বাতাসে।

অবশিষ্ট বনটুকু বাঁচানোর শেষ ডাক

স্থানীয় বাসিন্দারা এখন একটাই দাবি তুলছেন—নিরপেক্ষ তদন্ত, এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা। তাঁদের কথায় স্পষ্ট এক উদ্বেগ—দ্রুত অভিযান না হলে, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে, আর বন বিভাগের ভূমিকার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে টৈটংয়ের পাহাড়ে যা বনাঞ্চল এখনো অবশিষ্ট আছে, তা-ও অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে।

গোড়াগুলো এখনো মাটিতে আছে। প্রশ্ন হলো, গাছ আর কতদিন থাকবে।