একটি হাত, একটি পা, আর চারটি মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলে গেলেন ইসরাফিল


মানুষটার শরীরে পুরো একটা হাত ছিল না, একটা পা ছিল না। কিন্তু প্রতিদিন সকালে তিনি ঠিকই উঠে দাঁড়াতেন। ক্র্যাচে ভর দিয়ে, কখনো হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়তেন রাস্তায়। কারণ ঘরে বসে থাকলে চার মেয়ের মুখে ভাত উঠবে না- এই বাস্তবতা তাঁকে প্রতিদিন নতুন করে যুদ্ধে নামাত।

১১ জুন সেই যুদ্ধটা থেমে যায়। স্ট্রোক করে মারা যান ইসরাফিল। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ছোট্ট ঘরটায় তখন থেকেই নেমে আসে এক অন্তহীন অন্ধকার।

যে দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল একটা জীবন

প্রায় ১৫ বছর আগে চাকরির সুবাদে পটিয়ায় আসেন ইসরাফিল। পল্লী বিদ্যুতের কর্মী হিসেবে কাজ করতেন তখন- লাইনে লাইনে ঘুরে বিদ্যুৎ সচল রাখাই ছিল তাঁর দায়িত্ব। কিন্তু একদিন ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইন তাঁর জীবনের পুরো গতিপথ বদলে দেয়। দুর্ঘটনায় হারান একটি হাত, একটি পা।

স্বাভাবিক মানুষ যেখানে এমন আঘাতের পর ভেঙে পড়ে, ইসরাফিল ভাঙেননি। কাজ করার সক্ষমতা হারিয়ে তিনি বেছে নেন একটাই পথ- ভিক্ষাবৃত্তি। সমাজের চোখে যা হয়তো করুণার বিষয়, ইসরাফিলের কাছে তা ছিল সম্মানের লড়াই-কারণ তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল স্ত্রী আর চার কন্যাসন্তান, যাদের পেট ভরাতে তাঁকে রোজ ঘর থেকে বেরোতেই হতো।

চার মেয়ে, একটাই ভরসা- যা এখন নিভে গেছে

ইসরাফিলের স্ত্রী আরজু আক্তার এখন তাকিয়ে আছেন শূন্যতার দিকে। চার মেয়ে- বড় ইয়াছমিন, মেজ ইয়ানুর, আর দুই ছোট সন্তান- তাঁদের সবার ভবিষ্যৎ এখন একটামাত্র প্রশ্নের ওপর ঝুলে আছে: এরপর কী হবে?

বড় মেয়ে ইয়াছমিনের বিয়ের জন্য একসময় একটি এনজিও থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ইসরাফিল। ভিক্ষা করে যা পেতেন, তা থেকে একটু একটু করে কিছু অংশ শোধও করেছিলেন। কিন্তু বাকি ঋণের বোঝা এখনো রয়ে গেছে- আর সেই ঋণ শোধ করার মানুষটাই আর নেই।

মেজ মেয়ে ইয়ানুর স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। বাবার মৃত্যুর পর তার স্কুলের বেতন, বই-খাতার খরচ- এসব শব্দ এখন আরজু আক্তারের কাছে বিলাসিতার মতো শোনায়। আর সবচেয়ে ছোট দুই সন্তান, যারা এখনো বুঝতেই পারছে না বাবা কোথায় গেছেন, তাদের জন্য সামনে কী অপেক্ষা করছে- তা কেউ জানে না।

আশ্রয়ণের ঘরে এখন শুধু অভাব আর হতাশা

স্থানীয়রা বলছেন, ইসরাফিলের মৃত্যুর পর পরিবারটি পড়েছে চরম আর্থিক সংকটে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের যে ছোট্ট ঘরটিতে একসময় ইসরাফিল তাঁর সংগ্রামী জীবনের শেষ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন, সেখানে এখন বাকি আছে শুধু অনিশ্চয়তা আর নীরব কান্না। এখনো কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পরিবারটির কাছে পৌঁছায়নি- এই অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা নিজেরাই।

তবে আশার আলো একটু একটু করে দেখা দিচ্ছে। বিষয়টি জানার পর পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানুর রহমান জানিয়েছেন, পরিবারটির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবারটির অবস্থা পর্যালোচনা করে সরকারি সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একজন মানুষের লড়াই, একটা পরিবারের প্রার্থনা

স্থানীয়দের ভাষায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে পরিবারের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন ইসরাফিল। একটা হাত নেই, একটা পা নেই- তবুও থেমে থাকেননি তিনি, কারণ থেমে যাওয়ার সুযোগ তাঁর ছিল না। আজ তিনি নিজে থেমে গেছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া লড়াইটা এখন বর্তায় তাঁর স্ত্রী আর চার মেয়ের কাঁধে- যাদের কাঁধ এখনো এই ভার বহনের জন্য তৈরি নয়।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা একটাই- সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ আর মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে আসুক এই পরিবারের পাশে। কারণ একজন মানুষ চলে গেলে তাঁর সংগ্রাম শেষ হয় না- সেই সংগ্রাম তখন রূপ নেয় পেছনে থেকে যাওয়া মানুষগুলোর প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। আর এই লড়াইয়ে আরজু আক্তার ও তাঁর চার মেয়ে এখন একা- একটিমাত্র সহযোগী হাতের অপেক্ষায়।