
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পুলিশের ধাওয়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত আরিফ আবদুল্লাহ (২৫) ৮ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাত ৮টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্তব্যরত চিকিৎসক আরিফ আবদুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আরিফ আবদুল্লাহ কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁও থানার চৌফলদণ্ডী এলাকার কালু ফকির পাড়ার বাসিন্দা। তিনি নাজির হোসেনের ছেলে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ জুন মধ্যম মনকিচর মহল্লাপাড়া এলাকায় ইয়াবা ট্যাবলেট বহন করার সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরিফ আবদুল্লাহ। পরে বাঁশখালী থানা-পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। আরিফ আবদুল্লাহর মৃতদেহ বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় বাঁশখালী থানায় দায়ের করা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর একটি মামলার (মামলা নং-২৭, তারিখ ১৭/০৬/২০২৬) আসামি ছিলেন আরিফ আবদুল্লাহ।
এর আগে গত ১৭ জুন শহীদ (৩২) নামের আরও এক যুবক হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। নিহত শহীদের পূর্ণ পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তাঁর বয়স ৩২ বছর বলে জানা গেলেও পিতার নাম-পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এই দুই যুবকের মৃত্যুকে ঘিরে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশের দাবি, ২০ হাজার পিস ইয়াবা ফেলে পালিয়ে যাওয়া মোটরসাইকেল আরোহীদের পিছু নিয়েছিল পুলিশ। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা নিজেই ‘ধাওয়া’ করার কথা বললেও বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলছেন, এটি পুলিশের ধাওয়ার ঘটনা নয়। দুই কর্মকর্তার এমন ভিন্ন ভাষ্য ঘটনাটিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যায়, বুধবার (১৭ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে পুঁইছড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ পুঁইছড়ি ফুটখালী ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। দক্ষিণ পুঁইছড়ির ফুটখালী ব্রিজসংলগ্ন চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন বাঁশখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জামাল হোসেন, কনস্টেবল ওয়াসিম, কনস্টেবল রাসেল এবং কয়েকজন সোর্স। এ সময় একটি মোটরসাইকেলকে থামার সংকেত দেওয়া হলে সেটি না থেমে দ্রুত চলে যায়। পরে শীলকূপ ইউনিয়নের মহল্লাপাড়া এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়ে মোটরসাইকেলটি। এতে গুরুতর আহত হন মোটরসাইকেল আরোহী শহীদ ও আরিফ আবদুল্লাহ। আহতদের বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে শহীদের অবস্থার অবনতি ঘটে এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে একুশে পত্রিকার সঙ্গে আলাপকালে এসআই জামাল হোসেন দাবি করেন, মোটরসাইকেল আরোহীরা পালানোর সময় একটি কমলা রঙের ব্যাগ ফেলে যায়। ব্যাগটি তল্লাশি করে ২০ হাজার পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। এসআই জামাল হোসেন বলেন, তখন পুলিশ পেছনে ধাওয়া করছিল। তখন তারা ব্যাগটা ওখানে ফেলে দেয়।
এসআই জামাল হোসেন আরও জানান, ইয়াবা উদ্ধারের পর থানায় এবং পরিচিত লোকজনকে ফোন করে মোটরসাইকেলটির গতিবিধি জানানো হয়। পরে মোটরসাইকেলটি টাইমবাজার হয়ে শীলকূপ ইউনিয়নের মহল্লাপাড়া এলাকায় পৌঁছে একটি স্পিডব্রেকারে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং আহত শহীদ ও আরিফ আবদুল্লাহকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
তবে একই ঘটনায় ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, পুলিশের ধাওয়ায় তারা মারা যায়নি। তারা চেকপোস্টে সিগন্যাল অমান্য করে দ্রুত চলে যায়। যাওয়ার সময় একটি ব্যাগ ফেলে দেয়। পরে ব্যাগে ইয়াবা পাওয়া যায়। তখন পুলিশ তাদের পিছু নেয়। কিন্তু তারা অনেক দূরে চলে যাওয়ায় আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ওসি রবিউল হক আরও বলেন, যেখানে ইয়াবা পাওয়া গেছে, সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে তারা স্পিডব্রেকারে দুর্ঘটনায় পড়ে। অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে।
তবে ওসি রবিউল হকের বক্তব্যেও পুলিশ মোটরসাইকেলটির পিছু নিয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে এসআই জামাল হোসেন সরাসরি ধাওয়া করার কথা বলেছেন। ফলে ঘটনাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
