চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে আগ্রহী বেইজিং, অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব


বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। আজ শুক্রবার (২৬ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি উপস্থিত ছিলেন।

মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, কানেক্টিভিটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিস্তারিত কথা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি ইকোনমিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব এসেছে। এই ইকোনমিক করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, ট্রানজেকশন বাড়ানো এবং মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনকে আরও উন্নত করা।

চীন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, এই বন্দরের আধুনিকায়ন করে কীভাবে এটিকে একটি রিজিওনাল হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়, যেটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, অন্যান্য দেশের জন্যও ব্যবহৃত হবে, সেটা নিয়ে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে মোংলা পোর্টকে আপগ্রেড এবং আরও বেশি সার্ভিস ওরিয়েন্টেড করার জন্য চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

চীন সফরের শেষ দিন শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পিপল টু পিপল কানেক্টিভিটি জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংস্কৃতি, মিডিয়া, টেকনোলজি, সামগ্রিকভাবে নলেজ ট্রান্সফার এবং এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও বাড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিমধ্যে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিন ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল এডুকেশনকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই দুই ক্ষেত্রেই চীন তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায়। চীনা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা শিক্ষক এবং অবকাঠামোগত সহায়তা দেবে।

ভিসা প্রসেসিং সহজীকরণে চীন সরকার সহায়তা করবে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, হেলথকেয়ারের ক্ষেত্রে কীভাবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, বিভিন্ন ধরনের রোবোটিক সার্জারি এবং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য বিষয়ে চীন তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। এ ক্ষেত্রে চীন ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করে বাংলাদেশিদের জন্য তাদের দ্বার উন্মোচন করতে ইচ্ছুক।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন পাশে থাকবে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশ তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চায়। এ বিষয়ে কোনো সংলাপের প্রয়োজন হলে চীন সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক।

তিনি আরও বলেন, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের একটি আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত ভিত্তিতে ডায়ালগ শুরু হবে। এ নিয়ে বিস্তারিত কাজ করা হচ্ছে।

ব্রিকসে বাংলাদেশের যোগদানের ইচ্ছাকে চীন স্বাগত জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেন মাহদী আমিন। তিনি আরও বলেন, বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়নে দীর্ঘ মেয়াদে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে দিয়াওইউতাই হোটেলের কনফারেন্স হলে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের বিস্তারিত তুলে ধরে তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ তথ্য জানান।

মাহদী আমিন বলেন, বৃহস্পতিবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনা নেতৃত্বের সম্মতির ওপর ভিত্তি করে মোট ১৭টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি দুই দেশের সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে বিভিন্ন মিনিস্ট্রি টু মিনিস্ট্রি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনটি হয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে। আর একটি এমওইউ হয়েছে পলিটিক্যাল পার্টি টু পলিটিক্যাল পার্টি। অর্থাৎ বাংলাদেশে বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং চীনের ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে গত সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে যান। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের দালিয়ানে আসেন। বুধবার রাতে সেখান থেকে বেইজিং যান।