
বিয়ের অনুষ্ঠান তখনও শেষ হয়নি কারো মন থেকে। হাসি, গান, আনন্দের রেশ লেগে ছিল তিন ভাইয়ের মনে- আবু হেনা রুবেল আর তার দুই ভাই মোহাম্মদ ইকবাল ও মোমেন। পদুয়া এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে নিকটাত্মীয়ের বিয়েতে অংশ নিয়ে একই মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। রাতের আকাশে তখন সবে অন্ধকার নেমেছে। কিন্তু সেই রাতটাই হয়ে রইল তিন ভাইয়ের জীবনের সবচেয়ে নির্মম রাত।
শুক্রবার (২৬ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের পুরাতন বিওসি এলাকায় মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়ে সড়কে। মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দের সেই সন্ধ্যা বদলে যায় আর্তনাদে।
তিন ভাই, এক মোটরসাইকেল, একটাই দুর্ঘটনা
স্থানীয়রা দ্রুত ছুটে আসেন। রক্তাক্ত তিন ভাইকে তোলা হয় আমিরাবাদ সিটি হাসপাতালে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর বোঝা যায়, রুবেলের অবস্থা সংকটাপন্ন। তাকে দ্রুত স্থানান্তর করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু শরীরের আঘাত যে কতটা গভীর ছিল, তা আর সামলে রাখা গেল না। রাত সাড়ে ৯টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলে যান আবু হেনা রুবেল (৩২)। তার দুই ভাই মোহাম্মদ ইকবাল ও মোমেন নিয়েছেন প্রাথমিক চিকিৎসা।
নিহত রুবেল উপজেলার কলাউজান ইউনিয়নের সাম্মাহাজন বাড়ির মৃত আজিজুল হক মনুর ছেলে। চট্টগ্রামের বনফুল প্রতিষ্ঠানের একটি অফিসে কর্মরত ছিলেন তিনি- জীবনটা তখন ছন্দে চলছিল, কাজ-পরিবার নিয়ে সাজানো একটা জীবন। প্রতিবেশী কুতুব উদ্দিনের কণ্ঠেও সেই হঠাৎ চলে যাওয়ার ধাক্কা স্পষ্ট। তিনি জানান, বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে রাতে ফেরার পথেই এই দুর্ঘটনা ঘটে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাহ উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার বিষয়ে এখনও কেউ থানায় অবহিত করেনি-একটা প্রাণ চলে গেল, কিন্তু কাগজে-কলমে এখনও তার কোনো নিবন্ধন হয়নি।
একটা পোস্ট, যা আগেই বলে দিয়েছিল ভবিষ্যতের কথা
রুবেলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার বন্ধু আর পরিচিতজনেরা ছুটে যান তার ফেসবুক প্রোফাইলে—যেমন সবাই যায়, প্রিয়জনের শেষ স্মৃতিগুলো খুঁজতে। আর সেখানে গিয়েই তাদের বুক ভেঙে যায়। প্রোফাইলের ওপরের দিকে পিন করে রাখা একটা পোস্ট, যার শিরোনাম ‘আব্বুর সাথে আমার শেষ ছবি’।
পোস্টে রুবেল লিখেছিলেন, “আমার কাছের মানুষ হারিয়ে যাওয়ার লিস্ট দিন দিন বাড়তেছে।” এরপর একে একে তিনি লিখে রেখেছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের তারিখগুলো- ২০০৮ সালের ২১ মার্চ দাদুকে হারানো, তার ঠিক একদিন পর ২২ মার্চ বড় আন্টিকে হারানো, ২০১০ সালে দাদীর মৃত্যু, ২০২০ সালের ৭ জুন বড় আব্বুর চলে যাওয়া, ২০২২ সালের ১৭ মে নানার মৃত্যু- আর সবশেষে, ২০২৬ সালের ৬ মে নিজের বাবাকে হারানোর কথা।
পোস্টের শেষ লাইনে রুবেল লিখেছিলেন, “আল্লাহ তাআলা আব্বু সহ সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমীন।”
যে পোস্ট এখন নিজেই হয়ে উঠল এক বিদায়ী চিঠি
তখন সেই পোস্টটা ছিল একজন শোকার্ত ছেলের আবেগের প্রকাশ- বাবাকে হারানোর তাজা ক্ষত নিয়ে লেখা কয়েকটা লাইন। কেউ জানত না, মাত্র এক মাসেরও কিছু বেশি সময় পরেই এই তালিকায় যুক্ত হবে আরেকটা নাম- রুবেল নিজে।
বাবাকে হারানোর শোক তখনও পুরোপুরি কাটেনি রুবেলের। তিনি লিখেছিলেন তার “হারিয়ে যাওয়ার লিস্ট” দিন দিন বাড়ার কথা, বুঝতেই পারেননি যে এই লিস্টের পরের নামটা হবে তার নিজের জীবনের গল্পের শেষ পাতা। আজ যখন তার বন্ধু-স্বজনেরা সেই পোস্টে চোখ রাখছেন, তখন প্রতিটা লাইনই যেন নতুন অর্থ নিয়ে আসছে- একটা প্রার্থনা, যা এখন রুবেলের নিজের জন্যও পড়তে হচ্ছে সবাইকে।
একটা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, কিন্তু পেছনে অসংখ্য গল্প
সড়ক দুর্ঘটনার খবর আমাদের কাছে প্রায় প্রতিদিনের সংবাদ হয়ে উঠেছে- সংখ্যা আর পরিসংখ্যানে রূপ নেয় মানুষের জীবন। কিন্তু রুবেলের গল্পটা মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটা সংখ্যার পেছনে থাকে একটা সম্পূর্ণ জীবন, একটা পরিবার, আর কিছু অসমাপ্ত গল্প। যে মানুষটা মাত্র এক মাস আগে তার বাবার জন্য কেঁদেছিলেন, আজ তার জন্য কাঁদছে পুরো পরিবার আর বন্ধুমহল। আর তার ফেসবুকের সেই পিন করা পোস্টটা- যা একসময় ছিল শুধু ব্যক্তিগত শোকের দলিল-আজ হয়ে উঠেছে জীবনের অনিশ্চয়তা আর সময়ের নির্মমতার এক করুণ সাক্ষী।
দুই ভাই ইকবাল আর মোমেনের সামনে অপেক্ষা করছে আরেকটা কঠিন বাস্তবতা- বড় ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে বেঁচে থাকার শিক্ষা। আর রুবেলের সেই শেষ প্রার্থনা, “আল্লাহ তাআলা সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন,” আজ তার নিজের জন্যও উচ্চারিত হচ্ছে অগণিত মানুষের ঠোঁটে।
