পাহাড়ের ঢালুতে বিশ্ব ভ্রমণের ফসল


২০০৩ সালে যখন তিনি প্রথম পাহাড়ের ঢালুতে গাছের চারা পুঁততে শুরু করেছিলেন, তখন কারও যাতায়াতই ছিল না সেই এলাকায়। সমতল থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হতো বাগানে। কেউ তাঁকে বলেনি এই কাজ থেকে কী পাওয়া যাবে। নিজের শখ আর কৌতূহলই ছিল মো. ওমর শরীফের একমাত্র সঙ্গী।

আজ, দুই দশক পর, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সেই পাহাড়ি জমিতে দাঁড়িয়ে আছে ৫০ একরের এক বিস্ময়কর বাগান, যেখানে দেশি-বিদেশি অর্ধশত জাতের ফল ফলছে বছরের বারো মাসই। গাছে গাছে ঝুলছে এমন সব ফল, যা এক সময় শুধু বিদেশের বাজারেই দেখা যেত।

যে বাগানের নাম মায়ের নামে

ওমর শরীফ তাঁর তিলে তিলে গড়ে তোলা এই বাগানের নাম রেখেছেন মায়ের নামে, ‘জোহরা এগ্রো ফার্মস অ্যান্ড নার্সারি’। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এই গল্পের আসল চরিত্র, একজন মানুষের শ্রম, ভালোবাসা আর শিকড়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু মিরসরাই বা চট্টগ্রাম নয়, বাংলাদেশের প্রথম কয়েকটি ফলের আবাদ শুরু হয়েছে এই বাগানেই। অ্যাভোকাডো, থাই সফেদা, পিচফল, এলাচসহ বিশ্বের নামিদামি অনেক দুর্লভ ফল ও মসলার চাষ এখানে হচ্ছে নিয়মিতভাবে। পাহাড়ের লাল মাটিতে যেন ঘটে গেছে এক ভিনদেশি ফলের নিঃশব্দ বিপ্লব।

বিশ্ব ঘুরে চারা সংগ্রহের নেশা

ওমর শরীফের গল্পটা শুধু পরিশ্রমের নয়, এটা এক অদম্য কৌতূহলের গল্পও। নতুন জাতের ফলের চারা সংগ্রহ করতে তিনি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছেন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদি আরব এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারতেও, বেশ কয়েকবার করে। এই বিশ্ব পরিভ্রমণের প্রতিটি যাত্রা থেকে তিনি ফিরেছেন নতুন কোনো চারা বা বীজ হাতে নিয়ে, যা পরে রোপণ করেছেন তাঁর পাহাড়ি বাগানে।

পথটা মোটেও সহজ ছিল না, নিজেই স্বীকার করেন ওমর শরীফ। তিনি বলেন, চারা এনে লাগিয়ে দিলেই হয়ে যায় না, প্রতিটি ফলের চাষপদ্ধতি আলাদা, সেটা বুঝতেই সময় লেগেছিল তাঁর। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কা। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। চাষপদ্ধতি সম্পর্কে নিজে খোঁজখবর নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, সেই জ্ঞান প্রয়োগ করেছেন বাগানে, তারপরই এসেছে সাফল্য।

একটি বাগান, একশটি জাত

এই বাগানে এখন রয়েছে চাকাপাত, কিউজাই, ব্যানানা, রামগই, বারি-৪, গৌড়মতি, আম্রপালি, কাটিমন, ব্রুনাই কিং, চিয়াংমাই, মরিয়ম, কোকোনাট, মিয়াজাকি, অম্বিকা ও জেসি জাতের আম। আরও আছে তেঁতুল, চেনাক ফ্রুট, বারোমাসি মাল্টা, চাইনিজ কমলা, দার্জিলিং কমলা, চায়না-৩ লিচু, ভিয়েতনাম নারিকেল, গাব, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, লটকন, এমবি-২ আনারস, সিয়াম গ্রিন নারিকেল, থাই মিষ্টি লেবু, আমলকী, পিচ ফল, বেরিকেডেট মাল্টা, থাই সফেদা, থাই আমলকী, ড্রাগন, তিনফল, থাই জাম্বুরা, মাতুয়া, আবিও, কাঁঠাল, ডুরিয়ান, পুলসান এবং কাজুবাদাম, সব মিলিয়ে অর্ধশতাধিক ফলের গাছ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলাচ, দারুচিনি, আদা ও লবঙ্গের মতো মসলার চাষও।

একটামাত্র পাহাড়ি বাগানে এত রকমের ফল আর মসলার সমাহার দেখলে বিস্ময় জাগাই স্বাভাবিক। ওমর শরীফের নিজের ভাষায়, বিশ্বের নতুন নতুন উদ্ভাবিত ফল ও চারা সংগ্রহ করাটাই তাঁর নেশা, এবং সেখান থেকে চারা গজিয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহও করেন। কৃষি বিভাগ ও মসলা ইনস্টিটিউশনের কর্মকর্তারাও একাধিকবার তাঁর বাগান পরিদর্শন করেছেন বলে জানান তিনি।

মেলায় প্রদর্শনী, হাতে পুরস্কার

গত ২০ জুন মিরসরাই উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে অনুষ্ঠিত মৌসুমি ফল মেলায় নিজের বাগানের প্রায় ৪০ জাতের ফলের প্রদর্শনী করেন ওমর শরীফ, আর তাতেই অর্জন করেন পুরস্কার। একটি মাত্র বাগান থেকে এত বিচিত্র ফল দেখে মেলায় আসা দর্শনার্থীরাও অবাক হয়েছেন।

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, ওমর শরীফের বাগানে দেশি-বিদেশি অনেক ফল উৎপাদিত হচ্ছে, এবং তাঁর ধ্যান-জ্ঞান সবই এই নার্সারি ও বাগান ঘিরে। প্রায় দুই দশক ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা এই বাগানে আছে অনেক দুর্লভ প্রজাতির ফলের গাছ, যা সচরাচর দেখাই যায় না দেশের অন্য কোথাও।

এক মানুষের অনুপ্রেরণা, অনেকের নতুন পথ

ওমর শরীফের এই সাফল্যের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর চারপাশেও। কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায়ের ভাষায়, তাঁর দেখাদেখি এখন অনেকেই বাগান গড়ে তুলছেন এলাকায়। যে বেকার যুবকেরা একসময় দিশাহীন ছিলেন, তাঁরাও এখন উৎসাহ পেয়ে নিজেদের পাহাড়ি জমিতে বাগান গড়ে তোলার পথে হাঁটছেন।

কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা আর সততা, এই তিনটি শব্দই যেন ওমর শরীফের জীবনের মূলমন্ত্র। একটা শখ থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজ হয়ে উঠেছে মিরসরাই তথা বাংলাদেশের পাহাড়ি কৃষি অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার। যেখানে একদিন ছিল শুধু জঙ্গল আর পাহাড়ি ঢালু, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের নানা প্রান্তের স্বাদ আর গন্ধ নিয়ে একটা সবুজ স্বপ্নের সাম্রাজ্য।