
চট্টগ্রামের রাঙ্গাদিয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে (সিইউএফএল) বছরের পর বছর ধরে দরপত্র ভাগ করে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বড় কাজকে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে ২৫ লাখ টাকার নিচে নামানো, ই-জিপি এড়িয়ে ম্যানুয়াল দরপত্র করা এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ এখন দুর্নীতি দমন কমিশন ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের তদন্তে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে অনিয়মের আলামত পাওয়ার পর গত ২৫ মে দুদকের একটি দল সিইউএফএল কারখানা পরিদর্শন করে বিভিন্ন নথিপত্র জব্দ করেছে। একই ঘটনায় বিসিআইসিও উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তের আওতায় আছেন কারখানার কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্টোর ও আইটি বিভাগের কয়েকজন কর্মচারী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিইউএফএলের অনিয়মের মূল কৌশল ছিল দরপত্রকে ২৫ লাখ টাকার নিচে রাখা। কারণ বিসিআইসির নিয়ম অনুযায়ী, ২৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের কোনো কাজের দরপত্র সদর দপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং ই-জিপির উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়াতেই বড় কাজগুলোকে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে।
২০২৪-২৫ এবং সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কারখানার যন্ত্রাংশ মেরামত, ব্যাগিং, স্ট্যাকিং, পরিচ্ছন্নতা, প্রকৌশল, বাণিজ্যিক ও পরিবহন খাতের একাধিক কাজ এভাবে ভাগ করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
১ কোটি ৫০ লাখের কাজ ২ কোটি ৩০ লাখে
অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না থাকায় অনেক কাজের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। একটি ক্ষেত্রে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের কাজ ২ কোটি ৩০ লাখ থেকে ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকায় দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এক কাজেই অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ লাখ টাকা।
শুধু একটি কাজ নয়, গত এক অর্থবছরে কারখানার বিভিন্ন খাতে অর্ধশতাধিক দরপত্র ২৫ লাখ টাকার নিচে রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এসব দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়া এবং কাজ ভাগ করে দেওয়ার কারণে সরকারের কয়েক কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে থাকতে পারে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা বলে দাবি করেছেন।
কাগজে উন্মুক্ত, বাস্তবে নিয়ন্ত্রিত
কারখানার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কাগজে-কলমে দরপত্র উন্মুক্ত দেখানো হলেও বাস্তবে আগে থেকেই ঠিক করা থাকত কোন কাজ কোন লাইসেন্সধারী ঠিকাদার পাবেন। দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও বাইরের বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে চাইলে তারা নানাভাবে বাধার মুখে পড়ত।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এভাবে দরপত্র নিয়ন্ত্রণের কারণে একই গোষ্ঠীর ঠিকাদাররা বারবার কাজ পেয়েছেন। এতে একদিকে প্রতিযোগিতা কমেছে, অন্যদিকে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ, দুর্বল মেরামতকাজ এবং মানহীন সরবরাহের কারণে কারখানায় বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, দরপত্র ভাগ করার ফলে কেন্দ্রীয় অনুমোদন এড়ানো যায়। আবার ই-জিপির বদলে ম্যানুয়াল দরপত্র করলে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। তাঁর ভাষ্য, “নিয়মের ভেতর থাকার মতো দেখানো হয়, কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে প্রতিযোগিতা ঠেকানো।”
দুদকের হাতে নথি
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান শুরু করে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ মে একটি বিশেষ দল সিইউএফএলে গিয়ে দরপত্র, অনুমোদন, বিল, সরবরাহ, মেরামত ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথিপত্র জব্দ করে।
দুদক চট্টগ্রাম-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও এনফোর্সমেন্ট টিমের প্রধান সায়েদ আলম বলেন, “অনুসন্ধানে আমরা সিইউএফএলের কেনাকাটা ও ব্যাগিং কন্ট্রাক্টরের দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট অনিয়মের ছাপ পেয়েছি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বড় কাজগুলো ছোট ছোট ভাগে বা টেন্ডার স্প্লিটিংয়ের মাধ্যমে রূপান্তর করা হয়েছে। এটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়ানোর একটি বেআইনি কৌশল।”
তিনি আরও বলেন, “গত ২৫ মে আমরা কারখানায় সরাসরি অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিক ও কারিগরি বিভাগের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জব্দ করেছি। কারখানার কর্মকর্তাদের একাংশ এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের মধ্যে পারস্পরিক আঁতাতের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অডিট রিপোর্ট ও জব্দ করা ফাইলের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
দুদক সূত্রের দাবি, প্রাথমিকভাবে কিছু অনিয়মের আলামত পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তার বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে দ্রুত আনুষ্ঠানিক মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিসিআইসির তদন্তে কর্মকর্তারা
দুদকের পাশাপাশি সিইউএফএলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিআইসিও ঘটনাটি তদন্ত করছে। কারখানার তিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্টোর ও আইটি বিভাগের কয়েকজন কর্মচারীর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে বিসিআইসি সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তদন্তে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে আছে—কেন একই ধরনের কাজ ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হলো, ২৫ লাখ টাকার সীমা এড়ানোর চেষ্টা ছিল কি না, ই-জিপি পদ্ধতি বাদ দিয়ে ম্যানুয়াল দরপত্র কেন করা হলো, একই ঠিকাদার বা গোষ্ঠী বারবার কাজ পেয়েছে কি না এবং কাজের মান অনুযায়ী বিল পরিশোধ হয়েছে কি না।
চেয়ারম্যানের কঠোর হুঁশিয়ারি
সার্বিক বিষয়ে বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, “কেন্দ্রীয় নিয়ম এড়াতে ২৫ লাখ টাকার নিচে টেন্ডার ভাগ করার এই অপকৌশল কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। আমরা ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কারখানার ভেতরে বসে যারা এই সিন্ডিকেটকে মদদ দিচ্ছে, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনগতভাবে তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।”
বিসিআইসি চেয়ারম্যানের বক্তব্যে স্পষ্ট, সংস্থাটি দরপত্র ভাগ করার অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তবে তদন্ত শেষে কোন কর্মকর্তা বা কোন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এমডির বক্তব্য মেলেনি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমানের মোবাইল ফোনে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন লিখে বার্তা পাঠানো হয়। জানতে চাওয়া হয়, ২৫ লাখ টাকার সীমা এড়াতে দরপত্র ভাগ করা হয়েছে কি না, ম্যানুয়াল দরপত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে কি না, দুদক কোন কোন নথি জব্দ করেছে এবং বিসিআইসির তদন্তে কারা চিহ্নিত হয়েছেন।
তবে তিনি কোনো উত্তর দেননি। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
