- জায়গা না পেয়ে গাছের ডালে উঠে ফাইনাল খেলা দেখেন দর্শকেরা।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম মঙ্গলবার বিকেলে যেন পাহাড়ের এক বড় মিলনমেলা। গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। মাঠের চারপাশে মানুষের ঢল। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ রাস্তার ধারের ঢালু জায়গায়, কেউবা গাছের ডালে উঠে দেখছেন খেলা। পাহাড়ি-বাঙালি, শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ—হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে জমে ওঠে ৩১তম জোন কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল।
মাঠের লড়াইটাও ছিল দর্শকের প্রত্যাশার মতোই উত্তেজনাপূর্ণ। মুখোমুখি হয়েছিল কবাখালী ইউনিয়ন একাদশ ও বোয়ালখালী ইউনিয়ন একাদশ। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে অতিরিক্ত সময়সহ ১২০ মিনিটের লড়াই শেষ হয় ১-১ গোলে। এরপর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৪-২ গোলে কবাখালীকে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় বোয়ালখালী ইউনিয়ন একাদশ।
মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া ফাইনাল ঘিরে সকাল থেকেই দীঘিনালায় ছিল উৎসবের আমেজ। মিনি স্টেডিয়ামের গ্যালারি, মাঠের চারদিক, গাছতলা, এমনকি গাছের ডালেও ছিল দর্শকের ভিড়। প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি সেভ, প্রতিটি শটে মাঠের চারপাশে ওঠে করতালি আর উল্লাস। শেষ বাঁশি বাজার পর বোয়ালখালীর খেলোয়াড়-সমর্থকদের আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম।
দীঘিনালা জোনের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এবারের জোন কাপে অংশ নেয় ছয়টি দল। টুর্নামেন্টের সেরা দুই দল হিসেবে ফাইনালে ওঠে কবাখালী ও বোয়ালখালী। ফাইনালে দুই দলের লড়াই ছিল সমানে সমান। কবাখালীর নেপোলিয়ন চাকমা পুরো টুর্নামেন্টে নজর কাড়েন গোল করার দক্ষতায়। তিনি সেরা গোলদাতার পুরস্কার জিতেছেন। আর টাইব্রেকারে দৃঢ়তা দেখিয়ে সেরা গোলকিপার নির্বাচিত হন বোয়ালখালীর মো. হোসেন।

খেলা শেষে বিজয়ী ও রানার্সআপ দলের খেলোয়াড়দের হাতে মেডেল, ট্রফি ও প্রাইজমানি তুলে দেওয়া হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরস্কার বিতরণ করেন দীঘিনালা জোনের জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-আমিন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর শিহাবুন সাকিব রূশাদ, দীঘিনালা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শফিকুল ইসলাম, দীঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল বাহার, জোনের আরএমও, অ্যাডজুট্যান্ট, বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-আমিন বলেন, খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির অন্যতম সেতুবন্ধন। জোন কাপের মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দর্শকের উপস্থিতি তাঁকে মুগ্ধ করেছে জানিয়ে জোন অধিনায়ক বলেন, “আজ এত মানুষ পাশাপাশি বসে খেলা উপভোগ করেছেন, তাঁদের আনন্দ-উল্লাস আমাকে বিমোহিত করেছে। যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে এবং পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করতে দীঘিনালা জোন ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখবে।”
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, দীঘিনালা জোন প্রতিষ্ঠার পর থেকে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩১তম জোন কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়।
মঙ্গলবারের ফাইনাল শেষ হয়েছে বোয়ালখালীর শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে। তবে দীঘিনালার মিনি স্টেডিয়ামে আজ শুধু একটি দল জেতেনি; গ্যালারি থেকে গাছের ডাল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা মানুষের উচ্ছ্বাসে জয়ী হয়েছে খেলাধুলার আনন্দ, পাহাড়ের সম্প্রীতি আর মিলনমেলার সংস্কৃতি।

