
উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছেন না। শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করা প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখই এবার পরীক্ষার ফরম পূরণ করেননি।
বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এ পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিবছর কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়লেও এবার এই হার অস্বাভাবিক।
গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের বেশি। এক বছরের ব্যবধানে এই হার প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেননি।
শুধু ফরম পূরণে বাদ পড়া নয়, ফরম পূরণের পরও অনুপস্থিতির হার বাড়ছে। গত বছর এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। এর আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিতির সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ২০৩ জন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন। বাকি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন (৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ) ফরম পূরণ করেননি। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ফরম পূরণ করেননি ৬১ হাজারের বেশি, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক চিত্র বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের। এ বোর্ডে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন ফরম পূরণ করেছেন। অর্থাৎ, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশই এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না, যা গত বছর ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।
এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার জানান, অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় নির্ধারিত বছরে পরীক্ষায় অংশ নেয় না। তারা পরের বছর পরীক্ষায় বসে। এটি অনুপস্থিতির অন্যতম একটি কারণ।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি শিক্ষা বিভাগ। তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, নিবন্ধন করার পর দুই বছরের বিভিন্ন সময়ে এসব শিক্ষার্থী কার্যত পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়। এ বিষয়ে একটি গবেষণা করার পরিকল্পনা করছে তারা।
গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনুপস্থিতির প্রধান কারণ ছিল বাল্যবিবাহ। ঢাকা বোর্ডের অধীনে অনুপস্থিত ৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৩৫০ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া প্রস্তুতির অভাব ও দারিদ্র্যও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে আসে।
বুধবার সচিবালয়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দুর্বলতাগুলো বের করা হচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। সারা দেশে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন। কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকবে। যেসব দিন পরীক্ষা থাকবে না, সেসব দিন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চলবে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আরও জানান, এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী পরীক্ষা থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ বিষয়ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রে নেওয়া হবে। পরীক্ষা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
