
রহমত আলীর বাপ-দাদার ভিটা ছিল আনোয়ারার কর্ণফুলী তীরে। প্রায় এক দশক আগে সরকারি কর্মকর্তারা এসে বললেন, এই জমিতে বড় শিল্পাঞ্চল হবে, কাজ হবে হাজারে হাজারে, বদলে যাবে এলাকার চেহারা। রহমত আলী রাজি হলেন। জমি গেল। কিছুদিন পর এলো সাইনবোর্ড, এলো আশ্বাস, এলো উদ্বোধনের খবর। কিন্তু কারখানা আর এলো না। রহমত আলী এখনো অপেক্ষায় আছেন- সেই প্রতিশ্রুতির কারখানার, সেই প্রতিশ্রুতির কাজের। তাঁর ছেলে এখন শহরে রিকশা চালায়।
রহমত আলী একা নন। আনোয়ারার কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীর ঘেঁষে যেসব পরিবার শিল্পাঞ্চলের স্বপ্নে জমি ছেড়েছিল, তাদের অনেকের গল্প এখনো থমকে আছে একই জায়গায়। জমি গেছে, দশক পেরিয়েছে, কিন্তু দৃশ্যমান বদল আসেনি।
৫০ কোটি ডলারের স্বপ্ন, কিন্তু প্রশ্নও কম নয়
সেই অপেক্ষার মাঝেই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, প্রায় ১০ বছর আটকে থাকা প্রকল্পটি নতুন সরকারের চার মাসের মধ্যেই কাগজপত্রের দিক থেকে এগিয়েছে।
কিন্তু এই আশাবাদের পেছনে জমে আছে কিছু কঠিন প্রশ্ন। প্রকল্প বাস্তবায়নে গঠিত যৌথ কোম্পানিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের অংশীদারি মাত্র ৩০ শতাংশ, আর চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের ৭০ শতাংশ। বেজার ৩০ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে অধিগ্রহণ করা জমির ৫০ বছরের লিজমূল্যকে মূলধন ধরে। আর সিআরবিসি মাত্র ১০ কোটি ডলার নগদ বিনিয়োগের বিনিময়ে পাচ্ছে ৭০ শতাংশ শেয়ার।
অর্থাৎ বিনিয়োগ আসার আগেই বাংলাদেশকে জমি, সড়ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জেটি, পানি সংরক্ষণাগার, সীমানাপ্রাচীর ও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ বিশাল অবকাঠামোর দায় নিতে হচ্ছে। এই অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা- যার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, আর বিদেশি ঋণ ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগ প্রত্যাশা অনুযায়ী না এলে এই ঋণের বোঝা কে বহন করবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
এর বাইরে আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি ক্রয়নীতি অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডেভেলপার- দুটি ভূমিকায় থাকা উচিত নয়। কিন্তু এই প্রকল্পে সিআরবিসি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিল, আবার ডেভেলপার হিসেবেও মনোনীত হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনও এই দ্বৈত ভূমিকা ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু সেসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির আগেই প্রকল্প অনুমোদনের পথে এগিয়েছে।
গ্যাস নেই, বিনিয়োগ কমছে, তবু আশার পালে হাওয়া
প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী অনেকেই। বেজার নির্বাহী সদস্য মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, শতাধিক চীনা প্রতিষ্ঠান কারখানা স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে। চামড়া, হালকা প্রকৌশল, মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক শিল্পে বিনিয়োগ আসতে পারে। চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজাম প্রকল্পটিকে আনোয়ারাবাসীর জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যমান কারখানাগুলোই চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছে না। নতুন একটি বড় শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তার উত্তর নেই। বিনিয়োগের চিত্রও উৎসাহজনক নয়। গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিভাগে নিবন্ধিত বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। আর চীনা বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে চমকে দেওয়ার মতো- প্রায় ৮৯ শতাংশ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করেছেন, শুধু অনুমোদন যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আনা কঠিন হবে। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলামও সতর্ক করেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ দিতে গিয়ে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আনোয়ারার মানুষ তাকিয়ে আছে পাশের কোরিয়ান ইপিজেডের দিকে। প্রায় আড়াই হাজার একর জমিতে গড়ে ওঠা সেই শিল্পাঞ্চলে এখন ৪৮টি কারখানা, প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, রপ্তানি আয় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একটি শিল্পাঞ্চল সত্যিই চালু হলে কী হয়, তা আনোয়ারার মানুষ জানে। সেই কারণেই তারা আশা ছাড়েনি।
কিন্তু রহমত আলীর মতো মানুষেরা এখন প্রতীক চান না, চান বাস্তব ফল। জমি হারানো পরিবার চায় ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা, স্থানীয় তরুণ চায় কাজ। ৭০ শতাংশ মালিকানা বিদেশি ডেভেলপারের হাতে রেখে পরিবেশ, শ্রম অধিকার ও স্থানীয় কর্মসংস্থানে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে- এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল শেষ পর্যন্ত আরেকটি দীর্ঘ অপেক্ষার নামই হয়ে থাকবে।
প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে, শেষ হওয়ার কথা ২০৩১ সালের ডিসেম্বরে। রহমত আলী অপেক্ষা করছেন। তাঁর ছেলেও হয়তো করবে।
