চট্টগ্রামের বাজেট এবার ফলাফলের পরীক্ষায়


চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নতুন বাজেটকে প্রথম দেখায় বড় স্বপ্নের বাজেট বলা যায়। ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকার অঙ্ক, উন্নয়নকে অগ্রাধিকার, সড়ক, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য, মশক নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল সেবা, সবুজ নগর- সব মিলিয়ে এটি এমন এক বাজেট, যা শুনলে মনে হয় চট্টগ্রাম এবার হয়তো বদলাবে।

কিন্তু চট্টগ্রামের মানুষ বাজেটের ভাষা দিয়ে শহর মাপেন না। তাঁরা শহর মাপেন বৃষ্টির পর হাঁটু পানি দিয়ে, নালার দুর্গন্ধ দিয়ে, ভাঙা রাস্তার ধুলো দিয়ে, রাতের মশার কামড় দিয়ে। তাঁরা জানতে চান না কোন খাতে কত কোটি টাকা রাখা হয়েছে; তাঁরা জানতে চান, মুরাদপুরে পানি নামবে কখন, আগ্রাবাদে রাস্তা ডুববে কি না, হালিশহরে মশা কমবে কি না, চকবাজারে নালা পরিষ্কার থাকবে কি না।

এই জায়গাতেই চসিকের এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। সৌন্দর্য হলো, বাজেটে ভবিষ্যৎ ভাবনা আছে। দুর্বলতা হলো, সেই ভবিষ্যৎ কোন পথে, কত দিনে, কোন এলাকায়, কীভাবে নাগরিকের চোখে দৃশ্যমান হবে- তার পরিষ্কার মানচিত্র নেই।

চসিক বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড করেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক খবর। করপোরেশনের আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেনের চেষ্টা, দেনা কমানোর উদ্যোগ, নিয়মিত মনিটরিং, রাজস্ব বিভাগকে লক্ষ্যভিত্তিক কাজ করানো—এসব প্রশংসনীয়। দীর্ঘদিন ধরে যে করপোরেশন আর্থিক চাপে ছিল, তার জন্য রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড একটি স্বস্তির খবর।

কিন্তু এই স্বস্তির ভেতরেও একটি বড় প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। বিদায়ী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৫৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকেই এসেছে ১৯৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট রাজস্বের প্রায় ৩৬ শতাংশ এসেছে একক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। গৃহকর খাতের ৩৮৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকার মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশই অর্ধেকের বেশি।

এখানেই বাজেটের দুর্লভ ও গুরুত্বপূর্ণ পাঠটি লুকিয়ে আছে। চসিক কি সত্যিই স্বনির্ভরতার পথে হাঁটছে, নাকি একটি বড় প্রতিষ্ঠানের বড় পরিশোধে রাজস্বের ছবি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে? প্রশ্নটি তোলার অর্থ রাজস্ব আদায়ের সাফল্য খাটো করা নয়। বরং এই সাফল্যকে টেকসই করার পথ খোঁজা।

কারণ এবারের বাজেটে নিজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার বেশি। বিদায়ী বছরের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের তুলনায় এটি দ্বিগুণেরও বেশি। এত বড় লাফ দিতে হলে শুধু তাগাদা, সভা, মনিটরিং বা বড় প্রতিষ্ঠানের বকেয়া আদায় যথেষ্ট নয়। দরকার বিস্তৃত করভিত্তি, স্বচ্ছ মূল্যায়ন, নাগরিকবান্ধব আদায়ব্যবস্থা, ডিজিটাল ডেটাবেইস, বকেয়া আদায়ের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক সক্ষমতা।

এখানে আরও একটি বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি। বাজেট আলোচনায় কোথাও বিদায়ী বছরের নিজস্ব আয় প্রায় ৭৩৬ কোটি টাকা বলা হচ্ছে, আবার রাজস্ব আদায়ের হিসাবে দেখা যাচ্ছে ৫৫৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এই দুই অঙ্কের পার্থক্য কী? একটি কি মোট নিজস্ব আয়, আরেকটি কি আদায়কৃত রাজস্ব? নাকি হিসাবের শ্রেণিবিভাগ আলাদা? চসিকের উচিত পূর্ণ বাজেট বই, খাতভিত্তিক আয়-ব্যয় এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি নাগরিকদের জন্য সহজ ভাষায় প্রকাশ করা। কারণ অস্পষ্ট হিসাব থেকে আস্থা জন্মায় না; আস্থা জন্মায় খোলা হিসাব থেকে।

চট্টগ্রাম শহর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক দরজা। কিন্তু এই দরজার শহর এখনো বর্ষায় নিজেই আটকে যায়। জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের সবচেয়ে পুরোনো নাগরিক যন্ত্রণা। বছর বছর বাজেট আসে, বরাদ্দ আসে, প্রকল্প আসে, সভা হয়, সিদ্ধান্ত হয়। তবু প্রথম ভারী বৃষ্টিতে অনেক এলাকার মানুষ বুঝে যায়- কাগজে শহর বদলালেও রাস্তায় বদলায়নি।

জলাবদ্ধতা নিরসনে এবার ১১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু নাগরিকের প্রশ্ন এখন আর “কত টাকা” নয়। নাগরিকের প্রশ্ন- কোন খাল, কোন নালা, কোন ওয়ার্ড, কোন রাস্তা, কোন সময়সীমা? কোথায় কাজ শেষ হলে কোন এলাকার পানি কত দ্রুত নামবে? কোন সংস্থা কী করবে? সিডিএ, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড- কার দায় কোথায় শেষ, কার কাজ কোথায় শুরু?

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু ড্রেন পরিষ্কারের সমস্যা নয়। এটি সমন্বয়হীনতার সমস্যা, পরিকল্পনার সমস্যা, খাল দখলের সমস্যা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা, জোয়ার-ভাটার শহরে ভুল প্রকৌশল ভাবনার সমস্যা। তাই জলাবদ্ধতার বরাদ্দকে শুধু উন্নয়ন ব্যয়ের একটি লাইন হিসেবে রাখলে হবে না। এটি হতে হবে জনসমক্ষে প্রকাশযোগ্য কর্মপরিকল্পনা।

চসিক চাইলে এবার ভিন্ন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য “জলাবদ্ধতা ড্যাশবোর্ড” প্রকাশ করা যেতে পারে। কোন নালা কবে পরিষ্কার হলো, কোন খাল থেকে কত বর্জ্য উঠল, কোন স্থানে পানি নামতে কত সময় লাগল, কোন ঠিকাদার কাজ করছে, কত টাকা ব্যয় হলো- এসব তথ্য নাগরিকের জন্য খোলা রাখতে হবে। বরাদ্দের সঙ্গে ফলাফল না দেখালে নগরবাসী আর বিশ্বাস করবে না।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও একই কথা সত্য। চট্টগ্রাম প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য তৈরি করে। এই বর্জ্যের একটি অংশ সড়কে, নালায়, খালে গিয়ে জমে। পরে সেই বর্জ্যই বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণ হয়, আর সারা বছর দুর্গন্ধ, মশা ও রোগের উৎস হয়ে থাকে। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আলাদা খাত নয়; এটি জলাবদ্ধতা, জনস্বাস্থ্য ও শহরের সৌন্দর্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

চসিক পরিচ্ছন্ন নগরের কথা বলেছে। কিন্তু পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে শুধু ময়লা সরানো যথেষ্ট নয়। দরকার ঘর থেকে বর্জ্য আলাদা করা, নিয়মিত সংগ্রহ, আধুনিক ট্রান্সফার স্টেশন, পুনর্ব্যবহার, জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং খাল-নালায় বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা। এসবের স্পষ্ট রূপরেখা বাজেটে যতটা থাকা দরকার ছিল, ততটা দেখা যায় না।

একইভাবে মশক নিয়ন্ত্রণ এখন আর মৌসুমি কাজ নয়। চট্টগ্রামে ডেঙ্গু এখন সারা বছরের উদ্বেগ। হালিশহর, বন্দর, কোতোয়ালি, সদরঘাটসহ একাধিক এলাকায় ঝুঁকির কথা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেই উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে মশা নিধনকে শুধু ওষুধ ছিটানোর কাজে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। দরকার লার্ভা জরিপ, প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ, এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, নির্মাণাধীন ভবন তদারকি এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে স্থায়ী সমন্বয়।

মশার ওষুধ ছিটিয়ে ছবি তোলা সহজ। কিন্তু মশার জন্ম বন্ধ করা কঠিন। আধুনিক নগর সেই কঠিন কাজটাই করে। চসিকের বাজেটও সেই কঠিন কাজের দিকে এগোতে পারলেই তা সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব হবে।

বাজেটের আরেকটি বড় দিক হলো পরিচালন ব্যয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণ পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয়ে বড় অঙ্ক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একটি বড় নগর করপোরেশনের জন্য এসব ব্যয় অনিবার্য। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় যখন প্রায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে- নগরবাসীর করের টাকা কতটা সেবায় যাচ্ছে, আর কতটা প্রতিষ্ঠান চালাতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে?

চসিকের অনুমোদিত জনবল ও বাস্তব জনবলের ফারাক, অস্থায়ী কর্মী নির্ভরতা, দেনা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়—এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আর্থিক শৃঙ্খলার দাবি শুধু দেনা কমানোতে সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে দরকার ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো। একই রাস্তা বারবার কেন সংস্কার করতে হয়? একই ড্রেন কেন বারবার পরিষ্কার করেও জলাবদ্ধতা যায় না? কোন প্রকল্পে বিলম্ব হলে দায় কার? কোন ঠিকাদার কাজ শেষ করেনি? কোন ওয়ার্ডে বরাদ্দ গেল, কিন্তু ফল দেখা গেল না?

এগুলোই এখন নাগরিক বাজেটের আসল প্রশ্ন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এবারের বাজেটে আশার জায়গা আছে। ১০ লাখ গাছ লাগানোর ঘোষণা আছে। ডিজিটালাইজেশনের কথা আছে। হকারদের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেটের কথা আছে। পরিবেশবান্ধব নগরের কথা আছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম বদলাতে পারে। কিন্তু চট্টগ্রামের মানুষ বহু বছর ধরে ঘোষণা শুনে এসেছে। এখন তাদের দরকার দৃশ্যমান পরিবর্তন।

একটি শহর শুধু বড় বাজেটে বড় হয় না। একটি শহর বড় হয় যখন নাগরিক জানে তার করের টাকা কোথায় গেল। বড় হয় যখন বৃষ্টি হলে দোকানি দোকান বন্ধ করে পানি সেঁচতে বসেন না। বড় হয় যখন স্কুলগামী শিশুকে ময়লা পানির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হয় না। বড় হয় যখন মশার ভয়ে সন্ধ্যার পর জানালা বন্ধ করে থাকতে হয় না। বড় হয় যখন মেয়রের ঘোষণা ও রাস্তায় নাগরিকের অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব কমে আসে।

চসিকের এবারের বাজেট তাই একদিকে সম্ভাবনার দলিল, অন্যদিকে সতর্কবার্তা। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড হয়েছে- এটি ভালো। কিন্তু সেই রেকর্ড যদি বন্দরের বড় চেকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়, তবে তাকে টেকসই সাফল্য বলা যাবে না। উন্নয়নে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে- এটিও ভালো। কিন্তু সেই বরাদ্দ যদি ওয়ার্ডভিত্তিক ফলাফলে রূপ না নেয়, তবে তা নাগরিকের জীবনে পরিবর্তন আনবে না।

চট্টগ্রাম এখন আর প্রতিশ্রুতির শহর থাকতে চায় না। এটি ফলাফলের শহর হতে চায়। এবারের বাজেট সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন দরকার তিনটি কাজ- খোলা হিসাব, সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা এবং নাগরিকের চোখে দেখা যায় এমন ফল।

বর্ষার প্রথম ভারী বৃষ্টিই বলে দেবে বাজেটের কাগজ কতটা মজবুত। আর শহরের নালা, রাস্তা, খাল ও মশা বলে দেবে-চট্টগ্রাম সত্যিই বদলাচ্ছে, নাকি শুধু অঙ্ক বড় হচ্ছে।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।