শিল্পনগরের জন্য কেটে ফেলা গাছের গোড়া থেকে ফের বনাঞ্চল


চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) দেওয়া ২২ হাজার ৩৩৫ একর বনাঞ্চলের মধ্যে ৪ হাজার ১০৪ একর জমি ফেরত চেয়েছে বন বিভাগ।

হস্তান্তর করা ওই জমির অব্যবহৃত অংশে কেটে ফেলা গাছের গোড়া থেকে প্রাকৃতিকভাবে নতুন করে বন গড়ে উঠছে।

মিরসরাই উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহেনশাহ নাওশাদ জানিয়েছেন, বন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বেজা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে ওই জমি ফেরত চাওয়া হলেও এখনো তা পাওয়া যায়নি।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১২ সালে মিরসরাইয়ের সাহেরখালী, ইছাখালী ও মঘাদিয়া ইউনিয়নের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২২ হাজার ৩৩৫ একর বনাঞ্চল বেজার কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে ৩৩ হাজার ৮০৫ একর জায়গা নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে উঠেছে।

চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক চিঠিতে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী ৪ হাজার ১০৪ একর বনভূমি ফেরত পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।

চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পকারখানা থেকে যে কার্বন নিঃসরণ হবে, তা শুষে নিতে এই বন ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত মোকাবিলায় এটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্তে ডোমখালী খাল পর্যন্ত ৪ হাজার ১০৪ একর জমি সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেখানে গেওয়া, কেওড়া, হারগোজাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ জন্মেছে। এতে হরিণ, সাপ, মেছোবাঘসহ বিভিন্ন প্রাণী বাস করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের জিরো পয়েন্ট থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তৈরি করা সুরক্ষিত বাঁধ (সুপার ডাইক) ধরে দক্ষিণে ২১ কিলোমিটার পর্যন্ত বেজার সীমানা। বাঁধের পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগর এবং অন্য পাশে জেগে উঠেছে নতুন বন। বন বিভাগের ধারণা, সেখানে বর্তমানে ৪০০ থেকে ৫০০ হরিণ রয়েছে। তবে জিরো পয়েন্টের পশ্চিম পাশে থাকা প্রায় ১৫ একর বন কেটে ফেলার চক্রান্ত চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একসময় এই বনাঞ্চলে লাখ লাখ কেওড়া, গেওড়া ও বাইন গাছ ছিল। সেখানে ১০-১২ হাজার হরিণের পাশাপাশি শিয়াল, মেছোবাঘ, লজ্জাবতী বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ বাস করত। শিল্পনগরের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বনের সিংহভাগ ধ্বংস করায় জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। গত চার বছরে বন বিভাগ আটটি হরিণ উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে চারটিই মৃত ছিল।

গবেষণা সংস্থা নয়া দালান-এর গবেষক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, একসময় এই উপকূলীয় বনাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ হাজার হরিণ ছিল। এখন ৪০০-৫০০ হরিণ অবশিষ্ট থাকতে পারে, যারা ক্রমেই ছোট হতে থাকা বনভূমিতে বাস করছে। নতুন করে গড়ে ওঠা বন রক্ষা করা গেলে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল টিকে থাকবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত জানান, ২০২৫ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব এসেছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তফসিল পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

বেজার সদস্য মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে, যেখানে এখনো কোনো অবকাঠামো হয়নি, সেখানে কিছু বন তৈরি হয়েছে। বন বিভাগ ও বেজা সমন্বিতভাবে বসলে এর একটি সমাধান বের হবে।

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এম.এ হাসান বলেন, বেজা বন ধ্বংস না করেও অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তুলতে পারত। ওই এলাকায় হাজার হাজার একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ফাঁকা পড়ে আছে। অন্যান্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো সরকার সেই জমিও অধিগ্রহণ করতে পারত।

তিনি আরও জানান, যে অংশে এখনো কোনো অবকাঠামো তৈরি হয়নি, সেই ৪ হাজার ১০৪ একর বনভূমি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য গত বছর বেজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশা করছেন তিনি।