
মিসবাহুল জান্নাত জানতেন, দিনটা আসবে। প্রতিটি ভোরে উঠতেন এই অপেক্ষা নিয়ে- কখন আসবে তাদের সংসারের প্রথম অতিথি। স্বামী রুবেল প্রতিদিন হাত রাখতেন পেটে, কথা বলতেন না-আসা সন্তানের সঙ্গে। বলতেন, “এলে কোলে নিয়ে সারাদিন ঘুরব।” সেই দিনটা এলো।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে তাদের ঘর আলো করতে এলো ফুটফুটে এক কন্যা। কিন্তু কোলে তুলে নেওয়ার মানুষটি নেই। রুবেল চলে গেছেন চৌদ্দ দিন আগে- একটি সড়ক দুর্ঘটনায়, হঠাৎ, না-বলে।
বাবার স্বপ্ন থেমে গেল মহাসড়কে
গত ২৬ জুন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের পুরান বিওসি এলাকায় মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারান আবু হেনা রুবেল। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
লোহাগাড়া উপজেলার কলাউজান ইউনিয়নের সাম মহাজন বাড়ির আজিজুল হকের ছেলে রুবেলের বয়স হয়তো অনেকটা পথ যাওয়ার ছিল। কিন্তু সেই পথ থেমে গেল সন্ধ্যার আলো নেভার আগেই। পেছনে রেখে গেলেন সন্তানসম্ভবা স্ত্রী, পরিবারের অশ্রু আর বুকভরা স্বপ্নের একটি তালিকা- যা আর কখনো পূরণ হবে না।
আনন্দ আর কান্না একসঙ্গে
বৃহস্পতিবার দুপুরে রুবেলের মেয়ের যে কান্না ভেসে এলো, সেই কান্নার সঙ্গে মিশে গেল আরেকটি কান্না- স্বজনদের। রুবেলের ঘর একই সঙ্গে আলোকিত আর অন্ধকার হয়ে গেল।
রুবেলের ভাই মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, “রুবেল সবসময় বলতো, সন্তান এলে কোলে নিয়ে অনেক আদর করবে। কিন্তু আল্লাহর কী ইচ্ছা- সন্তান এলো, বাবা নেই। এই কষ্ট আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। নবজাতকের মুখ দেখলে একদিকে আনন্দ লাগে, আবার ভাইয়ের কথা মনে পড়লে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।”
স্থানীয় বাসিন্দা আরমান বলেন, “রুবেল খুব ভালো মনের মানুষ ছিল। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতো। একটি পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই বদলে গেল।”
মিসবাহুল জান্নাত এখন একা। শোকের ভার বুকে নিয়ে সামলাতে হবে নবজাতককে। স্বামীর স্মৃতি আর মেয়ের মুখ- এই দুটোই এখন তাঁর পৃথিবী। যে মেয়ে বাবার কোলের উষ্ণতা কখনো পাবে না, তাকে বড় করতে হবে একা হাতে।
পরিবার ও স্বজনরা নবজাতকের সুস্থতা এবং রুবেলের আত্মার মাগফিরাতের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে শেষ করে দিল একটি পরিবারের সব রঙ। এই মেয়ে একদিন বড় হবে, বাবার গল্প শুনবে মায়ের কাছে। কিন্তু বাবার হাতের ছোঁয়া- সেটা আর কোনো গল্পে ধরা দেবে না।
