
রফিকুল ইসলামের বাড়িটা মাটির ছিল। বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়নের মানিকপাঠান গ্রামে বাপ-দাদার আমল থেকে সেই বাড়িতেই সংসার। ছয়শো আড়ি ধান তুলে রেখেছিলেন বিক্রির জন্য। বন্যার পানি ঢুকল রাতের আঁধারে। সকালে উঠে দেখলেন- ধান ভিজে গেছে, আসবাব ভাসছে, মাটির দেয়াল গলে মিশে গেছে মেঝের সঙ্গে।
রফিকুল বললেন, “এখন দেখা যাচ্ছে শুধু ধ্বংসাবশেষ।” শুধু তাঁর বাড়ি নয়, গোটা বাঁশখালীর চিত্র এখন এটাই।
পানির নিচে ২১২টি গ্রাম, থামছে না দুর্ভোগ
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে স্মরণকালের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই এখন পানির তলায়। সরেজমিন পরিদর্শন করে পাওয়া তথ্য ও প্রশাসন-স্থানীয়দের তথ্যমতে, পাকা দালান ছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ডুবে আছে। কোথাও গলাসমান, কোথাও কোমরসমান পানি।
পানি ঢুকেছে হঠাৎ করে, প্রস্তুতির সুযোগ দেয়নি কাউকে। নলকূপ তলিয়ে গেছে, সুপেয় পানির তীব্র সংকট। শুকনো খাবার নেই। মাটির ঘর ভাঙছে একের পর এক। ধান-চাল-আসবাব সব ভেসে গেছে। বিদ্যুৎ নেই কয়েক দিন ধরে, মোবাইলে চার্জ নেই, বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন অনেকে। বাঁশখালী-চট্টগ্রাম মূল সড়কের একাংশ ভেঙে গেছে।
পুকুর, মাছের খামার, হাঁস-মুরগি— সব গেছে পানিতে। সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন অসুস্থ মানুষ আর গর্ভবতী নারীরা। এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরের বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন আতঙ্ক ছড়িয়েছে উপকূল জুড়ে।
মানিকপাঠান গ্রামে ২০ থেকে ২৫টি গবাদি পশু পানিতে ভেসে মারা গেছে। অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি পানির তলায়।
খাল দখল আর স্লুইসগেটের রাজনীতিতে ডুবল বাঁশখালী
এই দুর্যোগ শুধু প্রকৃতির রোষ নয়, এর পেছনে আছে মানুষের লোভের গল্পও। বাঁশখালীর পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ জলকদর খাল। সেই খাল দখল হয়ে ভরাট। স্লুইসগেটগুলো অকার্যকর। আর চিংড়ি চাষের নামে প্রভাবশালী মহল স্লুইসগেট আটকে রেখেছে নিজেদের স্বার্থে।
ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী গ্রামের বাসিন্দা জুনাইদুল ইসলাম বলেন, “ছনুয়ার তিন দিকে জলকদর, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। স্বাভাবিকভাবেই এখান থেকে পানি নিষ্কাশন হওয়ার কথা। কিন্তু চিংড়ি ঘেরের নামে প্রভাবশালীরা স্লুইসগেট আটকে রাখায় পুরো এলাকা তলিয়ে আছে।”
শেখেরখীল হিন্দুপাড়ার প্রান্ত দেব বলেন, “পানি কমছে না, উল্টো বাড়ছে।”
পাতিলে করে শিশু উদ্ধার
দুর্ভোগের এই ভয়াল চিত্রের মাঝেই আলো হয়ে এলো একটি মুহূর্ত। বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বাঁশখালীর চেচুরিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন কয়েকজন। খবর পেয়ে ছুটে গেল ফায়ার সার্ভিসের আটজনের দল। গলাসমান পানি ঠেলে তারা উদ্ধার করলেন পাঁচ শিশু ও আট নারীকে।
সেই উদ্ধারের একটি ২১ সেকেন্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। দেখা যাচ্ছে- এক হাতে রশি, অন্য হাতে একটি বড় পাতিল ধরে গলাসমান পানিতে এগিয়ে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য। পাতিলের ভেতরে আট মাস বয়সী একটি শিশু। পাশের সদস্য পাতিলের ওপর ধরে রেখেছেন ছাতা, যাতে বৃষ্টির পানি শিশুর গায়ে না লাগে। দুর্যোগের মাঝে মানবতার এই দৃশ্য দেখে চোখ ভিজে যাচ্ছে লাখো মানুষের।
দুই শিশুর প্রাণ গেল পানিতে
এই দুর্যোগ কেড়ে নিয়েছে দুটি নিষ্পাপ জীবনও। বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা এলাকায় শুক্রবার সকালে ছড়ার পানিতে ডুবে মারা গেছে মো. আশিক (১১)। প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে আশিক সাঁতার জানত না। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার মোহাম্মদ মিরাজও (৩) একইভাবে বাড়ির উঠানে থাকা অবস্থায় পানিতে ভেসে যায়।
ঢলে ভেসে গিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু বিষয়টি বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. এনাম নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দুই শিশুর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মসজিদে পানি, জুমাও হয়নি অর্ধশতাধিক মসজিদে
শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, ছনুয়া, বৈলছড়ি, কাথরিয়া, বাহারছড়া ও কালীপুর ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক মসজিদ তলিয়ে গেছে পানিতে। তিন দিন ধরে নামাজ পড়তে পারছেন না মুসল্লিরা। শুক্রবারও এসব মসজিদে জুমার নামাজ হয়নি।
মধুখালী আমজাদিয়া মসজিদের মাওলানা মাহমুদুল হক জানান, গলাসমান পানিতে মসজিদ ডুবে আছে। বায়তুর রহমান জামে মসজিদের সাঈয়েদুল হক বলেন, চার দিন জামাতে নামাজ পড়তে পারেননি।
ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না দক্ষিণ বাঁশখালীতে
উত্তর বাঁশখালীর কিছু এলাকায় ত্রাণ পৌঁছালেও দক্ষিণ বাঁশখালীর ছনুয়া, শেখেরখীল ও পুঁইছড়িতে মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। পুঁইছড়ির আরিফুল ইসলাম রকি বলেন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো প্রেমবাজার পর্যন্ত এসে ফিরে যাচ্ছে, কারণ সরলিয়া বাজার হয়ে আসার একমাত্র সড়ক পানির নিচে। আশ্রয়কেন্দ্রে অনেকে না খেয়ে দিন পার করছেন।
শুক্রবার সকালে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কালীপুর ইউনিয়নের গুণাগরী গ্রামে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে নেমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের দুর্ভোগের কথা শুনে শুকনো খাবার ও নগদ সহায়তা দেন। তিনি বলেন, দ্রুত পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন এবং সমাজের সামর্থ্যবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বাঁশখালী এখন পানির নিচে। দুটি শিশু চলে গেছে। বিশটির বেশি গরু ভেসে গেছে। শতবছরের পুরোনো ঘর ধ্বংস হয়ে গেছে এক রাতে। জলকদর খালের দখল আর স্লুইসগেটের রাজনীতি যে দুর্যোগ ডেকে এনেছে, তার হিসাব দিতে হবে একদিন। আপাতত, পাতিলে করে শিশু বাঁচানোর ছবিটুকুই বলছে- মানুষ এখনো মানুষের জন্য আছে।
