
৯ জুলাই। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে হঠাৎ নেমে আসে পাহাড়ি ঢল। মানুষ টের পাওয়ার আগেই ঘরে ঢুকে যায় পানি। যে সতর্কবার্তা আসার কথা ছিল কয়েক ঘণ্টা আগে, সেটা এলো যখন পানি ইতোমধ্যে কোমরসমান। কারণ একটাই- কক্সবাজারের রাডার বন্ধ, চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় রাডার কাভারেজ নেই, আর স্থানীয় পর্যায়ে মেঘের গতিবিধি বোঝার কোনো যন্ত্র নেই। দুর্যোগ এলো, মানুষ মারা গেল, তারপর এলো সতর্কতা।
এটা একটি ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থার নিয়মিত ব্যর্থতার গল্প। আর চট্টগ্রামের মানুষ এই ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় শিকার।
পাঁচটি রাডার, সচল মাত্র একটি- চট্টগ্রাম পুরোই অন্ধকারে
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি রাডার স্টেশনের মধ্যে কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সম্প্রতি ঝড়ে ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়ে অচল হয়েছে ঢাকার রাডারও। এখন সচল আছে কেবল রংপুরের একটি রাডার। অর্থাৎ চট্টগ্রাম উপকূল, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার— এই পুরো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এখন রাডারের বাইরে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ঢাকার রাডারের ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়েছে, পিডব্লিউডিকে জানানো হয়েছে। তবে রাডার একটি পার্টিকুলার প্যারামিটার, পূর্বাভাসে কোনো কমতি নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই কথায় একমত নন।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. রাফি উদ্দিন সরাসরি বলেন, রাডার ছাড়া আবহাওয়া পূর্বাভাস সম্ভব নয়। চট্টগ্রামের মতো ট্রপিকাল এলাকায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে একজায়গায় বৃষ্টি, পাশেই রোদ। এই স্থানীয় পার্থক্য রাডার ছাড়া ধরা যায় না।
রাডার না থাকলে কী হয়? মেঘের অবস্থান, বৃষ্টির তীব্রতা, ঝড়ের গঠন, বায়ুপ্রবাহের গতি- এই সব তথ্য পাওয়া যায় না। স্যাটেলাইট ছবিতে বড় চিত্র দেখা গেলেও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য মেলে না। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল, কক্সবাজার উপকূলে হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি- এই দুটো বিপদই রাডার ছাড়া আগে থেকে বোঝার উপায় নেই।
৬২ কোটির বজ্রপাত সেন্সর এখন ঘুমিয়ে
চট্টগ্রামে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। কৃষক, জেলে, নির্মাণ শ্রমিক- খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি মরছেন। এই মৃত্যু ঠেকাতে ২০১৮ সালে ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের আটটি স্থানে লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর বসানো হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো এখন কার্যত অকার্যকর। জনবল নেই, বিদ্যুৎ সংযোগ অনিয়মিত, রক্ষণাবেক্ষণ নেই। পরে আরও পাঁচটি সেন্সর কেনা হলেও সেগুলো ঠিকমতো চলছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে বিশেষজ্ঞদের।
ফলে বজ্রপাতের আগাম সতর্কতা এখনো স্বপ্ন। চট্টগ্রামের কৃষক এবং জেলেরা আকাশ দেখেই সিদ্ধান্ত নেন- যেমনটা তাঁদের বাপ-দাদারা নিতেন। সরকারি সেন্সর তাঁদের কোনো কাজে আসছে না।
শহরে বন্যা এলে কেউ জানায় না
চট্টগ্রাম শহরে ভারি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা এখন নিত্যঘটনা। কিন্তু শহরে বন্যার কোনো পূর্বাভাস ব্যবস্থা নেই। বুয়েটের আইডব্লিউএফএমের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ভারি বৃষ্টিতে শহরে বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া হয় না, অথচ চট্টগ্রামের মতো শহরের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও আবহাওয়া অধিদপ্তর যৌথভাবে বন্যা মডেলিং ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই উদ্যোগ এখনো নেই।
অর্থাৎ চট্টগ্রামের একজন নগরবাসী জানেন না আজ সন্ধ্যায় তাঁর গলি ডুববে কিনা। একজন জেলে জানেন না সকালে সাগরে নামা নিরাপদ কিনা। একজন কৃষক জানেন না বজ্রপাত কখন আসবে।
ধার করা তথ্যে চলছে আবহাওয়া সেবা
বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো আবহাওয়া স্যাটেলাইট নেই। জাপান, কোরিয়া, চীন, ভারতের স্যাটেলাইটের তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। দুর্যোগের মুহূর্তে যখন দ্রুত স্ক্যান দরকার, তখন অন্য দেশের স্যাটেলাইটের অগ্রাধিকার নিজেদের ভূখণ্ড। বাংলাদেশ তখন লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।
সুপার কম্পিউটার বা উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং অবকাঠামোও নেই। ভারত এই প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখনো মান্ধাতা আমলের সক্ষমতা নিয়ে টিকে আছে।
২০১৩ সালের পর আবহাওয়া অধিদপ্তরে নতুন নিয়োগ বন্ধ। পদোন্নতিতেও জটিলতা। দক্ষ জনবল নেই, ডেটা বিশ্লেষণের সক্ষমতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষিত আবহাওয়াবিদেরা বের হচ্ছেন, কিন্তু সরকারি সেবায় তাদের জায়গা নেই।
চট্টগ্রামের উপকূল, পার্বত্য অঞ্চল আর শহর- তিনটি জায়গাতেই আবহাওয়ার ঝুঁকি ভিন্ন, কিন্তু প্রতিটি জায়গায় পূর্বাভাস ব্যবস্থা দুর্বল। রাডার নেই, সেন্সর অকেজো, জনবল নেই, প্রযুক্তি পুরোনো। ঝড় আসে, বন্যা আসে, বজ্রপাত আসে- মানুষ মরে, তারপর তদন্ত হয়, তারপর ভুলে যায়।
প্রকৃতি কিন্তু ভোলে না। সে আবার আসে।
