
লক্ষী চাকমার বয়স সত্তর। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার দুর্গম পাকুইজ্জাছড়িতে তাঁর ছোট্ট ঘর। পায়ে দীর্ঘদিনের ঘা। টাকা নেই, যাওয়ার পথ নেই, তাই চিকিৎসাও নেই। প্রতি বছর বন্যা আসে, পানি সরে যায়, কিন্তু কেউ খোঁজ নিতে আসে না। এবার এলেন বিজিবির ডাক্তার। পায়ের ক্ষত দেখলেন, ওষুধ দিলেন।
লক্ষী চাকমা বললেন, “আমি অনেক উপকৃত হয়েছি।” এই একটি বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত থাকার দীর্ঘশ্বাস।
কাদা-নৌপথ পেরিয়ে বিজিবি পৌঁছাল দুর্গম পাহাড়ে
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের লক্ষিকার্বারী পাড়ার পাকুইজ্জাছড়ি— নামটাই বলে দেয় কতটা দূরে। বন্যা হলে এই পাড়ার মানুষ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ত্রাণ আসে না, চিকিৎসা আসে না, খোঁজ নেওয়ার মানুষও আসে না।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে সেই পথ ধরলেন ৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ইশতিয়াক আহম্মদ ইবনে রিয়াজ। হাঁটুসমান কাদা ডিঙিয়ে, নৌপথ পেরিয়ে সৈন্যদের নিয়ে পৌঁছালেন পাকুইজ্জাছড়িতে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিলেন খাদ্যসহায়তা, চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ। এরপর গেলেন ছোট মেরুং এলাকার চিটাইংগা পাড়ায়, সেখানেও একই কাজ।
ব্যাটালিয়নের মেডিক্যাল অফিসার ক্যাপ্টেন এম. আবদুল্লাহ আল-মামুন অসুস্থদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলেন, ওষুধ দিলেন, পরামর্শ দিলেন। দীর্ঘদিন চিকিৎসার মুখ না দেখা মানুষগুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
“প্রতিবছর বন্যা হয়, কিন্তু কেউ আসে না”
স্থানীয় বাসিন্দা জ্ঞানো চাকমার কথায় বছরের পর বছরের কষ্ট ঝরে পড়ল। তিনি বলেন, “প্রতিবছর বন্যা হয়, কিন্তু আমাদের খোঁজ নিতে কেউ আসে না। এবার বিজিবি এসে খাদ্যসহায়তা, চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দিয়েছে। এজন্য আমরা বিজিবির প্রতি কৃতজ্ঞ।”
বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইশতিয়াক আহম্মদ বলেন, গত ৫ জুলাই থেকে টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় দুর্গম এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিজিবি সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালনেও অঙ্গীকারবদ্ধ। মহাপরিচালকের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে এই কার্যক্রম চলছে।
বাবুছড়া ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন ও বিডিপি সদস্যরা ত্রাণ বিতরণে সহযোগিতা করেন।
পাকুইজ্জাছড়ির মানুষ হয়তো জানতেন না, এই দুর্যোগের মাঝে কেউ তাদের খুঁজে বের করতে হাঁটুসমান কাদা পেরোবেন। ত্রাণের প্যাকেট হাতে পেয়ে, ডাক্তার দেখিয়ে যে হাসি ফুটেছে তাদের মুখে— সেটাই বলে দেয়, দুর্যোগের মাঝে একটুখানি মানবিক স্পর্শ কতটা শক্তি দিতে পারে।
