
বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজার জেলায় সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় শিশুসহ ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা সাত দিনের বর্ষণে মাতামুহুরী নদীতে পাহাড়ি ঢল নেমে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলাসহ পুরো জেলায় এই বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
গত ১২ জুলাই বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও জেলার কৃষিখাত, মৎস্যসম্পদ এবং অবকাঠামোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র ফুটে উঠেছে।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, এই বন্যায় জেলার ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বন্যায় মারা যাওয়া ৩১ জনের পাশাপাশি পাঁচজন রোহিঙ্গা এবং ১৯ জন স্থানীয় নাগরিকসহ মোট ২৪ জন আহত হয়েছেন বলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা এবং মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, পাহাড় ধসে ও বন্যার স্রোতে ভেসে এই দুই এলাকায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়।
সবচেয়ে বেশি ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে পেকুয়া উপজেলায় এবং মাতামুহুরীতে ৮৫ শতাংশ ও চকরিয়ায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
এছাড়া কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ, মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এবং রামুর ৩৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
চকরিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১১ হাজার ২৩১টি পরিবারের প্রায় ৭৫ হাজার ৫০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নবসৃষ্ট মাতামুহুরী উপজেলার ৭ হাজার ৯৮১টি পরিবারের ৪০ হাজার ২০০ জন এবং পেকুয়া উপজেলার আট হাজার ৫৬২টি পরিবারের ৪৫ হাজার ৪৪৮ জন ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৭ হাজার ৪২৭টি পরিবারের ২৯ হাজার ৭০৮ জন এবং রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৭ হাজার ৪৮৫টি পরিবারের ২৯ হাজার ৯৪২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কুতুবদিয়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের এক হাজার ১২৫টি পরিবারের চার হাজার ৫০০ জন এবং ঈদগাঁও উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৮০০ জন মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল আলম জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয় এবং বর্তমানে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
দুর্যোগকালে জেলাজুড়ে ৮৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয় এবং সব উপজেলায় ২১৫টি অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন, ৮ লাখ ২৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও ২ হাজার ৫০০টি জেরিক্যান বিতরণ করা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় জেলার ১০ উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি জানান, এতে এক হাজার ৯৭ টন মাছ, ৩৮৫ টন চিংড়ি, ৩ কোটি ৫৬ লাখ মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়ে মৎস্য খাতে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক জানান, অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলায় এক হাজার ৬৬১ হেক্টর, কুতুবদিয়ায় এক হাজার ১২০ হেক্টর, পেকুয়ায় ৫০০ হেক্টর এবং রামুতে ৩৪০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া মহেশখালীতে ২৩৭ হেক্টর, টেকনাফে ১৪০ হেক্টর, কক্সবাজার সদরে ৮৮ হেক্টর, ঈদগাঁওয়ে ৭৫ হেক্টর এবং উখিয়া উপজেলায় ৫০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
বন্যায় জেলায় মোট ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
এর মধ্যে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন এবং পেকুয়ায় ৭ হাজার ২০ জন কৃষক রয়েছেন।
কুতুবদিয়ায় ৬ হাজার ৪১৫ জন, রামুতে ৪ হাজার ৮৭৫ জন, মহেশখালীতে ৪ হাজার ৩২০ জন এবং টেকনাফে ৩ হাজার ১২০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এছাড়া ঈদগাঁওয়ে ১ হাজার ৩০৪ জন, সদরে ১ হাজার ১৬৬ জন এবং উখিয়ায় ১ হাজার ১৩৮ জন কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, পাউবো বিভাগ-১-এর আওতাধীন ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ৪৪টি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে যাওয়ায় সেখানে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ এম খালেকুজ্জামান জানান, বন্যায় জেলায় ৩০৩টি খামারের ১ হাজার ২৯০টি গবাদিপশু এবং ৩৩০টি পোলট্রি খামারের ৯৭ হাজার ৫৮১টি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) হিসাব অনুযায়ী, জেলায় মোট ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া সদরে ২০ কিলোমিটার, রামুতে ৫০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ৯ কিলোমিটার, উখিয়ায় ৬ কিলোমিটার, টেকনাফে ৫ কিলোমিটার এবং ঈদগাঁওয়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সেতু ও কালভার্টের মধ্যে টেকনাফে ১৫টি, উখিয়ায় ১২টি, রামুতে ৫টি, সদরে ৪টি এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুটি করে রয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্যায় কক্সবাজারে মোট ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায় ১৫টি করে প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকায় সরকারি সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ দেওয়া হবে।
সব উপজেলা থেকে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা নিরূপণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
