জেল খেটে খালি হাতে ফিরলেন ৭৬ প্রবাসী


চার লাখ টাকা ঋণ করে দুই বছর আগে সৌদি আরবের পথে পা বাড়িয়েছিলেন নেত্রকোনার মো. রাসেল। চোখভরা স্বপ্ন ছিল- পরিবারের অভাব ঘুচবে, ঋণ শোধ হবে, ফিরবেন মাথা উঁচু করে। কিন্তু বাস্তবতা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল ভিন্ন এক চিত্রনাট্য নিয়ে। মরুভূমির দেশে পা রাখার পর প্রথম দিকে কোনো কাজই জোটেনি। পরে ভাগ্যক্রমে একটি উটের খামারে কাজ পেলেও নিয়মিত বেতন মেলেনি। এক পর্যায়ে আকামার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তাঁকে কাটাতে হয়েছে ১৬ দিনের কারাজীবন।

আজ সোমবার (২০ জুলাই) সকালে যখন তিনি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখলেন, তখন তাঁর পরনে একই কাপড়, পকেটে বাড়ি ফেরার ভাড়াটুকুও নেই।

রাসেল একা নন। তাঁর মতোই ৭৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশি আজ শূন্য হাতে ফিরেছেন সৌদি আরব থেকে- দালালের প্রতারণা আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরপাকড়ের শিকার হয়ে। সকাল ৭টা ৪৬ মিনিটে সালাম এয়ারের ওভি-৪০১ ফ্লাইটে তাঁরা দেশে ফেরেন। এই প্রবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত ১৮ জনের পাশে দাঁড়ায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক, বিমানবন্দরেই দেওয়া হয় জরুরি সহায়তা।

দালালের হাতে প্রতারিত হয়ে কারাগারে দিন কাটল যাঁদের

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ইমিগ্রেশন পুলিশ ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এই প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত এই বিদেশ-ফেরতদের তাৎক্ষণিক খাবার ও নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর যাতায়াত খরচ দেওয়া হয়েছে।

দেশে ফেরা প্রবাসীরা জানান, বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে নিয়মিত পন্থাতেই তাঁরা সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর অনেকের বৈধ নথিপত্রের (আকামা) মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও মেলেনি নবায়নের সুযোগ। কেউ কেউ আবার বৈধ কাগজপত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকরিদাতাদের হাতেই প্রতারিত হয়েছেন টাকা খুইয়ে। নথিপত্র না থাকায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়ে দেশে ফেরার আগে তাঁদের কাটাতে হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের মানবেতর কারাজীবন।

খুলনার ইব্রাহীম শেখের গল্পটাও একই সুরে বাঁধা, শুধু বিবরণে ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘১৫ মাস বিদেশে ছিলাম। প্রথম ৫ মাস কোনো কাজই পাইনি। পরের ১০ মাস কাজ করলেও বেতন পেয়েছি মাত্র ৫ মাসের। বকেয়া বেতন চাইলে মালিক জানান, যে দালাল কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, সে-ই সব টাকা নিয়ে গেছে।’ পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে দেশে গরু বিক্রি করে আরেক দালালকে টাকা দেন, যাতে তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—সেই দালালই তাঁকে তুলে দেন পুলিশের হাতে। ২১ দিন জেল খেটে আজ খালি হাতে দেশে ফিরলেন তিনি।

বাগেরহাটের সেলিম শিকদারের অভিজ্ঞতাও কম বেদনার নয়। ১০ মাস আগে সৌদি আরবে গিয়ে ছয় মাস কাজ করেও ঠিকমতো বেতন পাননি তিনি। পাওনা বেতন দাবি করতে গেলে উল্টো মালিকই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। এর মাশুল হিসেবে ২২ দিন কারাভোগ করে তবেই দেশে ফিরতে পেরেছেন তিনি।

শ্রমবাজার ঝুঁকিতে, প্রয়োজন কঠোর নজরদারি

দেশে ফেরা এই প্রবাসীরা জানান, দেশি-বিদেশি দালাল ও এজেন্সির অভিনব ভিসা জালিয়াতির কারণে পদে পদে চরম আর্থিক ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন নিরীহ বাংলাদেশিরা। এতে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারও ক্রমশ পড়ছে হুমকির মুখে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করার পাশাপাশি বিদেশগামীদের দালালের প্রলোভনে পা না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।

২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪৫ হাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশ-ফেরত অভিবাসীকে জরুরি সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই সহায়তা পেয়েছেন ৫ হাজারের বেশি প্রবাসী- একেকটি সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে রাসেল, ইব্রাহীম কিংবা সেলিমের মতো হাজারো স্বপ্নভঙ্গের গল্প, যা প্রতিদিনই লেখা হচ্ছে বাংলাদেশের অভিবাসন ইতিহাসে।