আট বছরের লড়াই থামল মুনতাসিরের


অবশেষে হার মানল দীর্ঘ আট বছরের এক জীবনসংগ্রাম। জন্মের পর থেকেই হাইড্রোকেফালাস—মস্তিষ্কে পানি জমার দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে নিরলস লড়ে যাওয়া ফটিকছড়ির আট বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ মুনতাসির আর নেই।

মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। এর আগে জীবনযুদ্ধে নিরন্তর লড়ে যাওয়া মুনতাসিরের বাবা আকরাম খান মানিক ছেলের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়েছিলেন। বিষয়টি একাধিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশও পেয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না—চিরতরে থেমে গেল ছোট্ট মুনতাসিরের জীবনের চাকা।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল্লাহ মুন্সির বাড়ির সন্তান মুনতাসির জন্ম থেকেই ভুগছিল এই দুরারোগ্য রোগে। গত আট বছরে তাকে ছয়বার অস্ত্রোপচারের টেবিলে উঠতে হয়েছে। অন্য শিশুরা যখন উঠোনে ছোটাছুটি করে, স্কুলের বেঞ্চে বসে বর্ণমালা শেখে, তখন হাসপাতালের বিছানা, অপারেশন থিয়েটার আর চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানই হয়ে উঠেছিল মুনতাসিরের শৈশবের নিত্যসঙ্গী।

সন্তানকে সুস্থ করে তুলতে বাবা আকরাম খান মানিক নিজের সব সঞ্চয় উজাড় করে দিয়েছিলেন, নিয়েছিলেন অঢেল ধারদেনাও। একের পর এক অস্ত্রোপচার, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটি একসময় প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন তাঁরা।

ছেলের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ বাবা আকরাম খান মানিক বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলেটাকে বাঁচাতে আপনাদের দোয়া আর একটু সহযোগিতা চেয়েছিলাম। আপনাদের সামান্য সাহায্যই হয়তো আমার সন্তানের নতুন জীবনের আশা হয়ে উঠবে—এই বিশ্বাস নিয়েই দিন গুনছিলাম। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হলো না।’ অসংখ্য মানুষের দোয়া, ভালোবাসা আর শুভকামনা সঙ্গী করেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেল ছোট্ট মুনতাসির।

পরিবারের স্বজনরা জানান, আর দশটা শিশুর মতোই সাধারণ ছিল মুনতাসিরের স্বপ্ন—স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলা, প্রাণ খুলে হাসা। কিন্তু জন্ম থেকেই দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করতে করতে তার সেই ছোট্ট স্বপ্নটুকু অপূর্ণই রয়ে গেল চিরকালের জন্য।

মুনতাসিরের মৃত্যুতে গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা আকরাম খান মানিক ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ও তাঁদের বাড়ির পরিবেশ।

একটি শিশুর দীর্ঘ জীবনযুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু রেখে গেছে এক অসহায় পরিবারের সীমাহীন বেদনা আর অপূর্ণ স্বপ্নের এক করুণ আখ্যান। প্রয়াত মুনতাসিরের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন তাঁর স্বজনরা।