
নূর বেগমের বয়স হয়েছে, কিন্তু লড়াই থামেনি। বোয়ালখালীর সারোয়াতলী ইউনিয়নের কঞ্জুরি নুরবক্স বাড়ির এই নারী বছরের পর বছর ধরে একটাই দাবি নিয়ে ঘুরছেন- বাবার জমি ফিরিয়ে দাও। ১৯৭২ সালে মনিন্দ্রলাল চক্রবর্তী সেই জমি বিক্রি করে গিয়েছিলেন তাঁর মায়ের কাছে। দলিলে সাক্ষী ছিলেন মিলন চক্রবর্তী।
কিন্তু পরে সেই মিলনই প্রতারণার মাধ্যমে একই জমিতে নিজের নামে খতিয়ান সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ। ইউনিয়ন পরিষদ তদন্ত করে রায় দিল- মিলনের কোনো মালিকানা নেই। মিলন নিজেও স্বাক্ষর করলেন সেই রায়ে।
তবু জমি মেলেনি। এর মধ্যে নতুন বিপদ- তদন্ত প্রতিবেদন পক্ষে দেবেন বলে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা চাইলেন ৮০ হাজার টাকা।
ঘুষের কথা অডিওতে ধরা পড়ল
সারোয়াতলী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা তারানুমা এলাহী তদন্তের অগ্রগতি জানতে আসা নূর বেগমকে বললেন, প্রতিবেদন পক্ষে দিতে হলে ৮০ হাজার টাকা লাগবে। তিনি নূর বেগমকে পুরোনো সব দলিলপত্র, টাকা নিয়ে মৌলভীবাজারের আগে ইউনিয়ন ব্যাংকের কাছে বাসায় দেখা করতে বলেন।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে নূর বেগম নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বলেন, “আমি তো ৮০ হাজার টাকা দিতে পারব না”
নূর বেগম সব শুনলেন, রেকর্ড করলেন। পরদিন ধার করে ৫ হাজার টাকা ও কিছু নাস্তা নিয়ে সেই বাসায় গেলেন। সেখানে গিয়ে উল্টো চাপ পেলেন ১ লাখ টাকার। নিরুপায় হয়ে ফিরে এলেন। অডিও রেকর্ড ও নথিপত্র তুলে দিলেন সাংবাদিকদের হাতে।
বিষয়টি জানাজানি হতেই তারানুমা এলাহী ফোনে নূর বেগমকে জিজ্ঞেস করলেন অডিও করেছেন কেন- সঙ্গে ভয়ভীতি ও হুমকি।
অভিযুক্তের বক্তব্যে অসংগতি
তারানুমা এলাহীকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে হাতে লেখা একটি বার্তা পাঠালেন। লিখলেন, সংবাদ “সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট”, তিনি নাকি শুধু নূর বেগমকে “সান্ত্বনা দিতে” পূর্বের মাধ্যমে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কিন্তু এই বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি রয়েছে। অডিও রেকর্ডে স্পষ্টভাবে ৮০ হাজার টাকা দাবির কথা শোনা যায়, এটি “সান্ত্বনা” বা “পরামর্শ” নয়, সুনির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ দাবি। তিনি দাবি করেছেন “অডিও ও অভিযোগে কোনো মিল নেই”। অথচ অডিও রেকর্ড ৮০ হাজার টাকা দাবির প্রমাণ রয়েছে।
তাঁর বিরুদ্ধে শুধু এই একটি অভিযোগ নয়, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, ঘুষ দাবি ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। বারবার অভিযোগ উঠলেও পার পেয়ে যাওয়ার কারণে দুঃসাহস বেড়েছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
এসিল্যান্ড বললেন লিখিত অভিযোগ দিন
বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার-ভূমি কানিজ ফাতেমা অডিও রেকর্ডের কথা জানেন। তবে তিনি বলেন, অডিও দেখে তদন্ত সম্ভব নয়। নূর বেগমকে জেলা প্রশাসক কার্যালয় বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই প্রশাসনিক বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই নূর বেগমের এখন একটাই পথ- লিখিত অভিযোগ দায়ের করা এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে লড়ে যাওয়া।
বছরের পর বছর ধরে পৈতৃক জমি ফেরত পেতে লড়ছেন নূর বেগম। প্রতিটি দরজায় হয়েছেন প্রতারিত বা হয়রান। এখন অডিও রেকর্ড হাতে নিয়ে তিনি বলছেন, ন্যায়বিচার চাই। তাঁর সেই দাবি কতটুকু পূরণ হবে- তা নির্ভর করছে প্রশাসনের সদিচ্ছার উপর।
