২৯ দিন কাঁচা মাছ খেয়ে বাঁচলেন শ্রীলঙ্কার বাবা-ছেলে, মহেশখালীতে উদ্ধার


বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে থাকা একটি ট্রলার থেকে শ্রীলঙ্কার দুই নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে।

টানা ৩৬ দিন সাগরে ভেসে থাকা ওই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে বাবা ও ছেলে।

এর মধ্যে টানা ২৯ দিন তাঁরা সাগরের কাঁচা মাছ খেয়ে বেঁচে ছিলেন।

গত বুধবার রাতে মহেশখালী উপকূলে ট্রলারে থাকা জিয়াউর রহমান নামের এক জেলের নজরে ভাসমান ওই নৌকাটি পড়ে।

গভীর সাগর থেকে তাঁদের উদ্ধার করে গতকাল শুক্রবার রাতে মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের তাজিয়াকাটা ঘাটে নিয়ে আসা হয়।

বর্তমানে তাঁরা কুতুবজোম ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা ও ট্রলারমালিক জিয়াউর রহমানের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

উদ্ধার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন ৫১ বছর বয়সী এস এইচ চামিন্দা এবং তাঁর ৩০ বছর বয়সী ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং।

তাঁদের বাড়ি শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোডে এবং পেশায় তাঁরা দুজনই জেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৩৬ দিন আগে চারজন জেলে একটি ট্রলারে করে শ্রীলঙ্কার উপকূলে মাছ ধরতে যান।

বৈরী আবহাওয়ায় ট্রলারটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে তা ভাসতে ভাসতে আন্দামান সাগরের দিকে চলে যায়।

তিন দিন পর অন্য একটি নৌকার সহায়তায় বাকি দুই জেলে দেশে ফিরে যান।

তবে নিজেদের ট্রলার হওয়ায় এস এইচ চামিন্দা ও সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং সেখানে থেকে যান।

এর সাত-আট দিন পর মিয়ানমারের কিছু লোক তাঁদের ট্রলারে উঠে দুরবিন ও ক্যামেরাসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়।

একপর্যায়ে ট্রলারটি ভাসতে ভাসতে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী উপকূলে এসে পৌঁছায়।

যাত্রা শুরুর সাত দিন পরই তাঁদের ট্রলারে থাকা মজুত খাবার শেষ হয়ে যায়।

এরপর টানা ২৯ দিন ধরে তাঁরা বড়শির টোপ হিসেবে রাখা খাবার এবং সমুদ্র থেকে ধরা কাঁচা মাছ খেয়ে বেঁচে ছিলেন।

উদ্ধারকারী ট্রলারের মাঝি জিয়াউর রহমান জানান, গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে ফেরার সময় বুধবার রাতে ভাসমান ট্রলারটি তাঁরা দেখতে পান।

কাছে গিয়ে তাঁরা দেখেন ভাসমান ট্রলারে দুজন মানুষ পড়ে আছেন এবং একজনের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ।

তাঁরা হাত জোড় করে বাঁচানোর আকুতি জানালে মানবিক কারণে জিয়াউর রহমান তাঁদের নিজেদের ট্রলারে তুলে নেন।

এরপর অচল ট্রলারটি রশি দিয়ে বেঁধে শুক্রবার রাতে মহেশখালীতে নিয়ে আসেন তিনি।

জিয়াউর রহমান আরও জানান, শ্রীলঙ্কান ভাষা বুঝতে সমস্যা হওয়ায় দুবাইপ্রবাসী দোভাষী তাঁর আত্মীয় সেলিমের মাধ্যমে বিদেশি দুই নাগরিকের পরিচয় শনাক্ত এবং ঘটনার বিস্তারিত নিশ্চিত হওয়া গেছে।

আজ শনিবার বিকেলে জিয়াউর রহমানের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, কোস্টগার্ডের সদস্যরা দোভাষীর সহায়তায় ওই দুই জেলের সঙ্গে কথা বলছেন।

এ সময় বিদেশি নাগরিকদের দেখতে স্থানীয় লোকজন সেখানে ভিড় জমান।

কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল জানান, চিকিৎসাসেবার পর দুজনের শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে রয়েছে।

তবে দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকায় তাঁরা অত্যন্ত ক্লান্ত।

বিদেশি নাগরিক হওয়ায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে বলেও শেখ কামাল উল্লেখ করেন।

মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুস সুলতান জানান, পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে দোভাষীর মাধ্যমে বিস্তারিত জেনেছে।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাঁরা শ্রীলঙ্কার জলসীমা থেকে ভেসে বাংলাদেশে চলে এসেছেন বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

পাসপোর্ট ছাড়া বিদেশি নাগরিকের বাংলাদেশে প্রবেশ আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ হলেও এই ঘটনার মানবিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মো. আবদুস সুলতান মন্তব্য করেন।

ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।