
পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা পলিমাটি জমে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মাতামুহুরী নদীতে জেগে ওঠা চর কেটে বালু লুটের মহোৎসব শুরু হয়েছে।
একই সঙ্গে নদীতে অবৈধভাবে শ্যালো মেশিন বসিয়ে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে বিস্তীর্ণ জনবসতি ও ফসলি জমি।
সাম্প্রতিক বন্যার পর চকরিয়া উপজেলা সদরের চিরিঙ্গা মাতামুহুরী সেতুর নিচে বিশাল আয়তনের এই বালুচর জেগে ওঠে।
স্থানীয় প্রশাসনের ধরপাকড় থেকে রক্ষা পেতে একটি চক্র দিনের পরিবর্তে রাতের বেলায় চর কেটে ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে এই অবৈধ বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা জড়িত থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রূপায়ন দেব জানান, জেলা প্রশাসনের ইজারা দেওয়া মহাল ছাড়া অন্য স্থান থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ।
কয়েকদিন আগে চিরিঙ্গা মাতামুহুরী সেতুর নিচে অভিযান চালিয়ে একটি শ্যালো মেশিন জব্দ করে ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারিতে রয়েছে এবং একদিন পর পর রাতের বেলায় সেখানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জড়িতরা যতই ক্ষমতাধর হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাতামুহুরী নদী চকরিয়া উপজেলার মানিকপুর থেকে শুরু হয়ে বরইতলী, কোনাখালী ইউনিয়ন এবং সাহারবিল ইউনিয়ন ঘুরে বদরখালীতে গিয়ে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মিলিত হয়েছে।
সরকারি নথিপত্রে এই নদী সিকস্তি বা খাস খতিয়ানের বেশিরভাগ জমির মালিক কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক। তবে কিছু জমির মালিকানা স্থানীয়দেরও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, খাস খতিয়ানভুক্ত এই জেগে ওঠা চর দখলে নিয়ে বালু ব্যবসায়ীরা কৃষকদের সবজি চাষের জন্য বর্গা দিয়ে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিতেন। এ বছর স্কেভেটর দিয়ে চর কেটে তাঁরা অবৈধ বালু বাণিজ্যে মেতেছেন।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ জানান, উজান থেকে নেমে আসা পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পানি ধারণক্ষমতা কমেছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ভাঙন বাড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে।
বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের চকরিয়া উপজেলা শাখা অফিসার (এসও) ও উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর ওপারে হাজিয়ান অংশে অন্তত দেড় কিলোমিটার ফসলি জমি ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে।
এছাড়া কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিরিঙ্গা সেতুর তলদেশও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে এই প্রকৌশলী উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের দাবি, বালু পরিবহনে প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০টি ডাম্পার ট্রাক চলাচলের কারণে এলাকার সড়ক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে জেগে ওঠা চরে চাষের জায়গা হারিয়ে দরিদ্র কৃষকরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় উপজেলায় শীতকালীন সবজির উৎপাদনও হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
