
চট্টগ্রামের খুলশীর গৃহিণী রাহেলা বেগম সকাল সাতটায় চুলা জ্বালাতে বসলেন। গ্যাস নেই। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করলেন। তারপর আরও এক ঘণ্টা। শেষ পর্যন্ত বাজার থেকে কিনে আনলেন ইলেকট্রিক চুলা। পাশের বস্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষেরা মাটির চুলায় লাকড়ি জ্বালিয়ে রান্না করছেন। আর নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন চালকেরা, তবু চাহিদামতো গ্যাস মিলছে না।
এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। চট্টগ্রামের লাখো মানুষ এখন একই সংকটে।
একটি টার্মিনালে আগুন, পুরো চট্টগ্রাম বিপর্যস্ত
এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনায় একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দৈনিক ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে আগে ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট মিলত। এখন তা নেমে এসেছে ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
সারাদেশে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। গত বছর থেকেই সরবরাহ ছিল গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর তা নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে। দেশে মোট গ্যাসের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে এলএনজি থেকে — একটি টার্মিনাল বন্ধ হতেই সেই নির্ভরতার মাশুল টের পাচ্ছে গোটা দেশ।
কারখানা বন্ধ, বিদ্যুৎ কমল দেড় হাজার মেগাওয়াট
গ্যাস সংকটে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএলসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ। শুধু কাফকো ও শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সীমিত পরিসরে কাজ চলছে। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট। অন্যান্য শিল্পকারখানাতেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা ক্ষীণ। তবে অক্ষত বয়লারটি চালু করা গেলে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। তবে নির্দিষ্ট করে কতদিন লাগবে বলা যাচ্ছে না।
সুতার ওপর ঝুলছিল গ্যাস খাত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, গ্যাস খাত দীর্ঘদিন ধরে সুতার ওপর ঝুলছিল। একটি টার্মিনাল বন্ধের পর বড়ভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থার কথা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছিল। স্থলভাগে আরেকটি টার্মিনাল থাকলে হয়তো এই সংকট এড়ানো যেত।
দেশি গ্যাসের উৎপাদন টানা কমছে কয়েক বছর ধরে। তাই বাড়ছে এলএনজির ওপর নির্ভরতা। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে শতভাগ ভাসমান টার্মিনালনির্ভর হওয়ার ঝুঁকি এখন স্পষ্ট। রাজধানীতে মোহাম্মদপুরবাসী মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের ঢেউ।
চট্টগ্রামে রাহেলা বেগমের ইলেকট্রিক চুলা কিনতে হয়েছে। বস্তির মানুষ লাকড়ি জ্বালাচ্ছেন। সিএনজি চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টার্মিনাল ঠিক হলে সংকট কাটবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই নির্ভরতার জাল থেকে বের হওয়ার পথ কবে খোঁজা হবে?
