
আগে এই মাঠে গরু-ছাগল চরাতেন তিনি। বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে, জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে চলত সংসার। আজ সেই মাঠেই যখন বিদেশি রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রী আর আমলাদের গাড়িবহর ঢুকল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে, তখন তাঁর জন্য বরাদ্দ ছিল শুধু একটাই জায়গা—দূরে দাঁড়িয়ে থাকা।
“এরা আমাদের বড় বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে,” ক্ষোভ চাপতে না পেরে বলেন বৈরাগ ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. শাহাদাত হোসেন। “আমরা বৈরাগ ইউনিয়নের মানুষ, আমাদের জমির ওপর ৭৮৩ একরের এই জোন হচ্ছে। অথচ শুরুতেই স্থানীয় হিসেবে আমাদের ন্যূনতম মূল্যায়ন নেই, সেখানে ভবিষ্যতে আর কী পরিবর্তন আসবে? পরিবর্তন যা হওয়ার বড়লোকদের হবে, বড়লোকেরা আরও বড়লোক হবে। আর গরিব আরও গরিব হবে।”
একই ক্ষোভ মোহাম্মদপুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল শুক্কুরের কণ্ঠেও। নিজের জীবিকা হারানোর আর্তনাদ তুলে তিনি বলেন, “আগে এই অঞ্চলে আমরা গরু-ছাগল চরাতাম, গাছ-বাঁশ সংগ্রহ করে সংসার চালাতাম। এখন এই প্রকল্পের কারণে আমাদের সেই শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেওয়া হলো। গরিবের কপাল থেকে দুমুঠো ভাতের সংস্থানও গেল।” একই এলাকার আরিফ খাঁন ও শাকিবুল ইসলামও প্রায় একই সুরে জীবিকা হারানোর কথা জানান।
সোমবার (২৭ জুলাই) ঠিক এই বৈরাগ ইউনিয়নের বেলচূড়া এলাকায়ই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল দীর্ঘ এক দশক ধরে ঝুলে থাকা বহুল আলোচিত চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)। প্রধান অতিথি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষায় এটি “চট্টগ্রাম তথা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি মাইলফলক”। কিন্তু যে মাটিতে দাঁড়িয়ে এই মাইলফলক গড়া হলো, সেই মাটির মানুষদের জন্যই অনুষ্ঠানস্থলে ঠাঁই হলো না।

স্বপ্নের প্রকল্পে যাদের ঠাঁই হলো না
উদ্বোধনী মঞ্চ বা অনুষ্ঠানস্থলে বৈরাগ ইউনিয়নের সাধারণ বাসিন্দাদের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি। এমনকি সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সাধারণ গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর ছিল কড়াকড়ি। একদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের মতো ভিআইপিদের উপস্থিতি, অন্যদিকে যাদের জমিতে এই জোন হচ্ছে, সেই স্থানীয়দের বর্জন—এই বৈপরীত্যই উদ্বোধনী দিনেই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে।
মঞ্চে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, অর্থমন্ত্রীর বড় ঘোষণা
মঞ্চে অবশ্য ছিল উচ্ছ্বাস আর বড় বড় সংখ্যার হিসাব। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “চায়না ইকোনমিক জোনে শুধু ৫০০ মিলিয়ন ডলার নয়, আমার মনে হয় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত।” তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা এবং এক কোটি চাকরির লক্ষ্য পূরণের পথে এই প্রকল্প একটি বড় পদক্ষেপ। তাঁর ভাষ্যে, এখানে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
তবে বিনিয়োগের পাশাপাশি পরিবেশ ও শ্রমিক-কল্যাণের কথাও ভুলে যাননি অর্থমন্ত্রী। “আমাদের পরিবেশটা রক্ষা করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য যে আবাসনের ব্যবস্থা হবে, সেটা খুব ভালো খবর। শুধু ইন্ডাস্ট্রি না, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত করতে হবে,” বলেন তিনি। চীনা রাষ্ট্রদূতের প্রতি তাঁর সরাসরি আহ্বান ছিল, আনোয়ারা বা চট্টগ্রামে একটি দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র (স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার) প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হওয়ার জন্য, যাতে নতুন গড়ে ওঠা শিল্পে দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করা যায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও এই উদ্বোধনকে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
আর মঞ্চের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটুকু আসে বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর মুখ থেকে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গিয়ে চায়না রোডস অ্যান্ড ব্রিজের চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এই জোন চালু করতে কত বছর লাগবে। উত্তরে পাঁচ বছরের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী নাকি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন—আগামী ১৮ মাসের মধ্যেই তিনি এই ইকোনমিক জোনে প্রথম কারখানা চালু হতে দেখতে চান।

এক দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান যেভাবে হলো
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এরপর প্রায় এক দশক নানা প্রশাসনিক ও বাস্তবায়ন-জটিলতায় প্রকল্পটি ঝুলে ছিল। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের ঠিক আগে, গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন মেলে।
সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) বাস্তবায়িতব্য এই প্রকল্পের নাম “সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন”। আনোয়ারায় প্রায় ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে উঠবে এই শিল্পাঞ্চল, যার বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, বাকি ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে চীন। প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে।
বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা) জানিয়েছে, শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সড়ক, বহুমুখী জেটি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), পানি সংরক্ষণাগার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধাসহ বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে এই অঞ্চলে।
উৎসবের মাঝেই সীমিত প্রবেশাধিকার নিয়ে ক্ষোভের আগুন
মঞ্চের ঘোষণা আর সংখ্যার হিসাবের বাইরে গিয়ে যখন বৈরাগ ইউনিয়নের দিকে তাকানো যায়, তখন ছবিটা অন্যরকম। যে জমিতে এই মেগা প্রকল্প গড়ে উঠছে, সেই জমির প্রকৃত মালিক ও বাসিন্দাদেরই রাখা হয়েছে অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে। স্থানীয় সংবাদকর্মীদেরও অনেকটা একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যাদের নামে দেওয়া হচ্ছে, সেই “উপকারভোগী” জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর এই আনুষ্ঠানিকতায় কোথাও প্রতিফলিত হয়নি—এই প্রশ্নই এখন স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দীন বলেন, অনুষ্ঠান পরিচালনার পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেছে বেজা কর্তৃপক্ষ। তবে তিনি স্থানীয়দের ক্ষোভের কারণ খুঁজে পাননি। “এটা তো আনোয়ারাবাসীর সম্পদ, এটাতে স্থানীয়রা ক্ষোভ কেন প্রকাশ করবে,” বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, “যতটুকু জানি, এখানে চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার থাকবে।”
তবে ইউএনওর এই আশ্বাস আর মাঠ পর্যায়ের ক্ষোভের মধ্যে ফারাকটা স্পষ্ট। অনুষ্ঠান-ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ যে বেজার হাতে, তা স্বীকার করলেও কেন স্থানীয়দের জন্য প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হলো এবং চাকরি-ব্যবসায় অগ্রাধিকারের প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব ইউএনওর বক্তব্যে মেলেনি।
যাদের জমিতে স্বপ্ন, তাদের হাতেই শূন্য থালা
অর্থমন্ত্রী মঞ্চ থেকে বলেছেন, “সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখেই আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে।” কিন্তু বৈরাগ ইউনিয়নের যে মানুষগুলো এই কথারই সবচেয়ে সরাসরি প্রাপক হওয়ার কথা, তাঁদের কাছেই এখনো প্রশ্ন—এত বড় স্বপ্নের ভাগ তাঁদের ভাগ্যে কতটুকু জুটবে। এক লাখ কর্মসংস্থান আর এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণার মধ্যে যে প্রশ্নটা অনুচ্চারিতই থেকে গেল, তা হলো—যে মাঠে একদিন গরু-ছাগল চরত, সেই মাঠের মালিকদের ঠিকানা এখন কোথায়।
