
মায়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট রিজান বড়ুয়া অপেক্ষা করছিল। সবাই তাকে বলেছে, “মা ঘুমাচ্ছেন।” তাই বারবার সেই মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে সে, হয়তো এখনই মা চোখ মেলে তাকাবেন, তাকে বুকে জড়িয়ে নেবেন। ছয় বছর বয়সী শিশুটি এখনও জানে না, এই ঘুম যে চিরদিনের।
মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিজানের সেই নিষ্পাপ দৃষ্টির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্পর্শ করেছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়। শুধু মাকেই হারায়নি রিজান; হারিয়েছে তার অনাগত ভাই বা বোনকেও, যার পৃথিবীর আলো দেখার কথা ছিল আর মাত্র এক মাস পর।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তেকোটা বড়ুয়া পাড়া গ্রামে ঘটেছে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সেনাবাহিনীতে কর্মরত জনি বড়ুয়ার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রিমা বড়ুয়া নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে স্বামীর সঙ্গে পটিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। সেখানে হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। বাঁচানো যায়নি তাঁর গর্ভের সন্তানকেও। পরদিন শনিবার নিজ গ্রামে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মা ও অনাগত সন্তানকে একসঙ্গে শেষ বিদায় জানানো হয়।
সোমবার (২৭ জুলাই) জনি বড়ুয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকদিন আগেও যে ঘরে ছিল হাসি-আনন্দ আর নতুন অতিথিকে ঘিরে স্বপ্ন, সেখানে এখন শুধু নিস্তব্ধতা আর কান্নার আবহ। পরিবারের কারও মুখে কথা নেই।
জনি বড়ুয়ার ছোট ভাই, ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত অয়ন বড়ুয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ২০১৮ সালে জনি ও রিমার বিয়ে হয়েছিল। এক বছর পর ঘর আলো করে আসে রিজান। ২০২৩ সালে আরেকটি সন্তান জন্মের আগেই মারা যায়। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার রিমা ও তাঁর গর্ভের সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার।
“ভাবি শুধু একজন গৃহিণী ছিলেন না, আমাদের পুরো পরিবারের অভিভাবক ছিলেন। সবাইকে আগলে রাখতেন। এখন ঘরের প্রতিটি কোণেই তাঁর শূন্যতা,” বলেন অয়ন।
বর্তমানে স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিজান। মায়ের মৃত্যু কী, তা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি সে। বারবার মায়ের খোঁজ করছে, আর পরিবারের সদস্যরা তাকে বুঝিয়ে বলছেন—”মা ঘুমিয়ে আছেন।”
স্বামী জনি বড়ুয়া বলেন, “হঠাৎ করে সবকিছু শেষ হয়ে গেল। কীভাবে এই শোক সামলাব, জানি না। এখন শুধু ছেলেকে নিয়েই সময় কাটানোর চেষ্টা করছি।”
রিজানের মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর অসংখ্য মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকেই শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেন আর কোনো পরিবারের জীবনে না আসে, এটাই সবার প্রার্থনা।
