‘তুমি ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন বাবা, সাংবাদিকরা কি ভয় পায়?’

২৬ জুলাই, ২০২৬। দিনটি ছিল রোববার। আমার শিক্ষাজীবনের স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ভাইভার মাধ্যমে অনার্স জীবন শেষ হতে চলেছে। আমার বিভাগ ছিল বাংলা। বাংলা নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি সমাপ্ত করা মামুলি ব্যাপার নয়। হাঁটি হাঁটি পা পা করে পার করলাম ৬টি বছর। সাধারণত অনার্স কোর্স ৪ বছর মেয়াদি হলেও করোনাকালীন সেশনজটের কারণে অনার্স সম্পন্ন করতে আমাদের লেগেছে ৬ বছর।

যা-ই হোক, পটিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগীয় প্রধান শামছুন নাহার খানম ম্যাম ভাইভার আগের দিন, অর্থাৎ ২৫ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নোটিশ দিয়েছেন সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে সবাইকে কলেজে হাজির হওয়ার জন্য। পরদিন ২৬ জুলাই, আমি সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠলাম। আধা ঘণ্টায় রেডি হয়ে ৭টা ৩০ মিনিটে আমার চট্টগ্রাম শহরের বাসা থেকে রওনা দিলাম নতুন ব্রিজের উদ্দেশে। বহদ্দারহাট থেকে আধা ঘণ্টায় নতুন ব্রিজ অর্থাৎ শাহ্ আমানত সেতুর গোলচত্বরে পৌঁছালাম। সেখান থেকে ৮টা ৩ মিনিটে পটিয়াগামী একটি বাসে চেপে বসলাম। রওনা দিলাম পটিয়ার উদ্দেশে।

৮টা ৪৫ মিনিটে আমি পটিয়া থানার মোড়ে পৌঁছানোর পর একটি বেকারিতে ঢুকে সকালের নাশতাটা দ্রুত সেরে নিলাম। এরপর কলেজে প্রবেশ করলাম। ডিপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে দেখি, কেউ আসেনি। সবার আগে আমি হাজির। যা-ই হোক, সময় নষ্ট করা যাবে না। শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে লাইট-ফ্যান চালু করে বই খুলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরগুলোতে আবার চোখ বুলিয়ে সময় পার করলাম।

ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে ৯টা বাজতেই সহপাঠীরা একে একে সবাই হাজির। কিছুক্ষণ পর এসেছেন শামছুন নাহার ম্যাম। সাড়ে ১১টা থেকে ভাইভা আরম্ভ হলো। প্রথমে ডাকা হলো সহপাঠী সুমাইয়া বিনতে আজাদকে। ৫ মিনিট পর ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হতেই সবাই সুমাইয়াকে ঘিরে ধরল। বলল, তাকে কোন কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়েছে। এরপর সুমাইয়া সবাইকে ধারণা দিয়ে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করল।

আমার সিরিয়াল নম্বর ছিল ১০। অফিস সহকারী শুভ দাদা একজনের পর আরেকজনকে ডাকতে লাগলেন। এভাবে ডাকতে ডাকতেই আমার ডাক পড়ল। আমি ডিপার্টমেন্টে প্রবেশ করলাম। আমি অনুমতি নিয়ে সালাম দিয়ে প্রবেশ করতেই শামছুন নাহার ম্যাম বললেন, ‘এই তো আমাদের সাংবাদিক হাজির’। আমি হাজির হওয়ার আগের মুহূর্তে ম্যাডাম নাকি অন্য কলেজ থেকে আসা ভাইভা বোর্ডের ম্যাডামকে বলেছেন, ‘এখন আমার সাংবাদিক আসবে। ছেলেটা পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে। খুব সাহসী।’

এবার আমাকে চেয়ারে বসার অনুমতি দিলেন। আমি বসে স্বাক্ষর করলাম। স্বাক্ষর করার পর ভাইভা বোর্ডের ম্যাডাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার কোন বিষয়ের পরীক্ষা সবচেয়ে ভালো হয়েছে। তখন আমি বললাম, ‘সব বিষয়ের পরীক্ষা ভালো হয়েছে। এর মধ্যে ‘বাংলা উপন্যাস-৩, বাংলা নাটক-২ ও বাংলা ছোটগল্প-২ এর পরীক্ষা সবচেয়ে ভালো হয়েছে।’ তখন তিনি ওই তিন সাবজেক্ট থেকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন। কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর আমি অস্বস্তি বোধ করছিলাম। কারণ, আমি আজ পর্যন্ত কোনো শিক্ষকের চোখে চোখ রেখে কথা বলিনি। তাই ভাইভায় হাসিমুখে চোখে চোখ রেখে মায়ার দৃষ্টিতে কথা বলা আমার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। আমি অস্বস্তি বোধ করলে পাশে বসা শ্রদ্ধেয় শামছুন নাহার ম্যাম আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘তুমি ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন বাবা, সাংবাদিকরা কি ভয় পায়?’

ভাইভা বোর্ডের ম্যাডাম টেবিলে রাখা ফলমূল খাচ্ছিলেন আর আমাকে হাসিমুখে প্রশ্ন করছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, ‘এবার তুমি যেতে পারো বাবা।’

আমি হাসিমুখে কুর্নিশ জানিয়ে বের হলাম। আমি বের হওয়ার পর উদগ্রীব সহপাঠীরা জিজ্ঞেস করল, ‘এই বেলাল, তোর কাছ থেকে কী কী জিজ্ঞেস করল?’ তখন আমি তাদের বললাম, ‘তেমন কঠিন কিছু জিজ্ঞেস করেনি। তোমরা ভয় পেয়ো না। বুকে সাহস রাখো।’

এবার একে একে ২৯ জনের ভাইভা শেষ হলো। মাঝখানে আমাদের জন্য চলে এল নাশতা। শামছুন নাহার ম্যাম আমাদের জন্য নাশতার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি সকাল থেকেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ভ্লগ ভিডিও বানানো শুরু করলাম। হাসিমুখে সবার কাছ থেকে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে অনুভূতি জানতে চাইলাম। সহপাঠীদের মধ্যে যারা কখনো ক্যামেরার সামনে কথা বলেনি, তাদেরও রাজি করালাম। যারা রাজি হচ্ছিল না, তাদের বললাম, ‘জীবনে এমন দিন আর কখনো ফিরে আসবে না। তাই আজকের দিনটিকে সবাই স্মরণীয় করে রাখো।’ আমার এ কথায় সবাই নির্দ্বিধায় রাজি হয়ে গেল।

ভাইভা শেষ হওয়ার পর একসঙ্গে কলেজের আঙিনায় ফটোসেশন পর্ব, রিলস ভিডিও বানানোর মুহূর্ত ছিল আরও অসাধারণ।

ভাইভা শেষ হওয়ার পর শামছুন নাহার ম্যাম বললেন, ‘ম্যাডামকে একটু গাড়িতে তুলে দিয়ে এসো।’ তখন আমার সহপাঠী মামুন আর আমি গিয়ে চট্টগ্রাম শহরগামী একটি বাসে ভাইভা বোর্ডের ম্যাডামকে তুলে দিয়ে এলাম। বাসের হেল্পারকে গাড়ি ভাড়াটাও দিয়ে দিলাম। তখন ওই ম্যাডাম আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘এই ছেলে, তুমি আমার ভাড়া কেন দিলে?’ তখন আমি চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণ পর বললাম, ‘সমস্যা নেই ম্যাম।’ তখন তিনি কাছে ডেকে আমার নামটা জিজ্ঞেস করলেন। বাসা কোথায় জিজ্ঞেস করলেন। শহরে গেলে সরকারি সিটি কলেজে যেতে বললেন। এরপর সালাম দিয়ে বিদায় নিলাম।

এভাবে কেটে গেল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণীয় দিন। আমার এই ক্ষুদ্র লেখায় হয়তো দিনটিকে ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারিনি। কিন্তু মনের গহিনে আজীবন গেঁথে থাকবে এই দিনের কথা। ভালো থাকুক কলেজ জীবনের প্রিয় বন্ধুরা। ভালো থাকুন মাতৃতুল্যা শামছুন নাহার খানম ম্যাম। সবাইকে খুব মিস করব।

লেখক: সদ্য বিদায়ী স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী, পটিয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।