
সকাল আটটা। রান্নাঘরে চুলার আঁচে খুন্তি নাড়ছেন মা। ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর তাড়া। ডিম ভাজায় ঢালছেন বোতলের সয়াবিন তেল, চায়ে দিচ্ছেন দুই চামচ চিনি, আর ছোট মেয়ের ফিডারে ঢালছেন গুঁড়া দুধ গোলানো পানীয়। এই দৃশ্য দেশের প্রায় প্রতিটি ঘরের—নিরীহ, রোজকার, বিশ্বাসের। কিন্তু এই মা জানেন না, তাঁর সাজানো নাশতার থালায় প্রতিদিন মিশছে অদৃশ্য এক শত্রু—মাইক্রোপ্লাস্টিক।
খালি চোখে অদৃশ্য এই প্লাস্টিক কণা এখন ঢুকে পড়েছে সয়াবিন তেল, চিনি ও দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি খাদ্যপণ্যে। তিনটি পৃথক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, দেশের বাজারে থাকা প্রায় প্রতিটি নমুনাতেই মিলেছে এই দূষণ।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি নিছক দূষণ নয়—এ যেন প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে ধীরগতির এক বিষক্রিয়া, যার প্রভাব হয়তো আজ বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্যে তার ছাপ পড়তে পারে গভীরভাবে।
সয়াবিন তেলে মিলল আশঙ্কাজনক দূষণের প্রমাণ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞানীদের যৌথ একটি গবেষণায় ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে সংগ্রহ করা বোতলজাত ও খোলা—মোট ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল উদ্বেগজনক—প্রতিটি নমুনাতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। গড় হিসাবে প্রতি লিটার তেলে পাওয়া গেছে ৫৩ হাজার ৯২২টি কণা। ব্র্যান্ডেড বোতলজাত তেলে এই সংখ্যা গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি হলেও খোলা তেলে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৭৭৮টিতে—অর্থাৎ বোতলজাত তেলের তুলনায় প্রায় সোয়া গুণ বেশি।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসে এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের সন্ধান পাওয়া গেছে। শনাক্ত হওয়া কণার মধ্যে সবচেয়ে বেশি—৮২ দশমিক ৫ শতাংশ—ছিল আঁশ বা ফাইবারজাতীয়, আর রঙের বিচারে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি, ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারেও একই বিষয়ে আলাদা একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তেজগাঁও এলাকার খোলা তেলের নমুনায় সবচেয়ে বেশি দূষণের কথা বলা হয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্যমতে, প্লাস্টিকের পাত্র বারবার ব্যবহার, খোলা অবস্থায় তেল বিক্রি-সংরক্ষণে অনিয়ম এবং শিল্পাঞ্চলের বায়ুদূষণ—এসবই এই কণা তেলে মেশার সম্ভাব্য কারণ। বোতলজাত তেলেও দূষণ পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং ও পরিবহণ প্রক্রিয়া নিয়েও।
চিনির নমুনাতেও মিলল প্লাস্টিক কণা
শুধু তেল নয়, নিত্যদিনের চায়ের কাপে মেশা চিনিও রেহাই পায়নি এই দূষণ থেকে। গবেষক সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমানের পরিচালিত একটি গবেষণায় ঢাকার খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, পরীক্ষিত নমুনার ৯৫ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে। প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত কণা পাওয়া গেছে—ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি, খোলা চিনিতে ৪০৩টি। গবেষকদের মতে, উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহণ ও প্যাকেজিং—প্রতিটি ধাপ থেকেই এই কণা চিনিতে মিশে যেতে পারে।
শিশুর দুধেও থাবা বসিয়েছে প্লাস্টিক দূষণ
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে দুধ নিয়ে করা গবেষণায়, কারণ এই খাদ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল দেশের শিশুরা। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সানাউল্লাহ মজুমদারের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গবেষণা অনুদানে সম্পন্ন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কাঁচা দুধ, বাজারজাত তরল ও গুঁড়া দুধসহ মোট ৪১টি নমুনার প্রতিটিতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষকদের আশঙ্কা, দুধ সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়েই এই কণা দুধে প্রবেশ করছে। তিনটি গবেষণাতেই পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিইটি, নাইলন, পিভিসি, পলিইউরেথেন ও টেফলনসহ একাধিক ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে, যার বড় অংশই কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্লাস্টিকের যন্ত্রপাতি, ফিল্টার, পাইপ বা প্যাকেজিং উপকরণ থেকে বাতাস কিংবা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে খাদ্যে মিশে যেতে পারে।
টুথপেস্টেও মিলল একই দূষণ, নড়ল আদালত
শুধু খাদ্যদ্রব্য নয়, মুখগহ্বরে ব্যবহৃত পণ্যেও একই দূষণের হদিস মিলেছে। পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) সম্প্রতি এক গবেষণায় জানায়, বাজারের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এই তথ্য প্রকাশের তিন দিনের মাথায় হাইকোর্ট বিষয়টি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তুলনামূলকভাবে খোলা সয়াবিন তেলের দূষণ নিয়ে একই মাত্রার আলোচনা বা প্রশাসনিক তৎপরতা তেমন দেখা যায়নি, যদিও তেল-চিনি-দুধের মতো পণ্য প্রতিদিন প্রতিটি মানুষের পাতে থাকে, টুথপেস্টের চেয়ে ঢের বেশি পরিমাণে শরীরে প্রবেশ করে।
প্রতি বছর হাজারো কণা ঢুকছে শরীরে
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, শুধু সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে চিনি ও দুধ থেকে পাওয়া কণা। দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় শিশুদের শরীরে এই কণা প্রবেশের সম্ভাব্য হার আরও বেশি বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। যদিও কোনো গবেষণাই মাইক্রোপ্লাস্টিককে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেনি, তবে দীর্ঘমেয়াদে শরীরে এসব কণা জমতে থাকলে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।
চিকিৎসকের ভাষায় ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদের মতে, অতিক্ষুদ্র এই প্লাস্টিক কণা রক্তনালিতে প্রদাহ তৈরি করে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্ত্রে প্রদাহ, হজমের সমস্যা এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও তিনি তুলে ধরেছেন। শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করলে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা আছে বলেও তিনি জানান। এ ছাড়া প্লাস্টিকের কিছু রাসায়নিক উপাদান হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে প্রজনন স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি অতি ক্ষুদ্র কণা মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে ভবিষ্যতে স্নায়বিক রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের প্রশ্ন তদারকি নিয়ে
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন খাদ্যমান তদারকি সংস্থার ভূমিকা নিয়ে। তাঁর ভাষায়, যেসব খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সেগুলো দেশের মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই বাজারে ছাড় পেয়েছে। ফলে এই তদারকিতে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
তিনি দাবি করেছেন, দূষিত পাওয়া খাদ্যপণ্যগুলো পুনরায় পরীক্ষা করা এবং সমস্যা মিললে তা বাজার থেকে প্রত্যাহারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই
টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে হাইকোর্ট যেভাবে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোনো তদারকি বা নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের নজির নেই। অথচ প্রতিদিনের ভাত-তরকারি রান্নার তেল, চায়ের চিনি বা শিশুর দুধ—এই তিন খাদ্যপণ্যেই মিলেছে শতভাগের কাছাকাছি দূষণ, যার পরিমাণ টুথপেস্টের তুলনায় অনেক বেশি এবং প্রতিদিনের গ্রহণের হারও বেশি।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, বাংলাদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন ও প্যাকেজিং প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর নীতিগত উদ্যোগ এখনই জরুরি। নইলে যে মায়ের হাতে সাজানো সকালের নাশতা আজ আপনজনের ভালোবাসার প্রতীক, আগামী দিনে তা-ই হয়ে উঠতে পারে নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকির উৎস।
