
দুপুর সাড়ে বারোটা। শাহ আমানত হলের করিডোর ধরে ক্লাস শেষে ফিরছেন এক সংযুক্ত ছাত্র। পেটে ক্ষুধা, হাতে টাকা—কিন্তু ডাইনিংয়ের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতে পারেন, এই টাকা তার কোনো কাজে আসবে না। ভেতর থেকে ভেসে আসছে ভাতের গন্ধ, চামচের টুংটাং শব্দ। কিন্তু তার জন্য নেই একটা প্লেটও। কারণ মাসের ১ তারিখে তিনি অগ্রিম টাকা জমা দেননি। নিয়মটা এমনই- নগদ টাকায় এখানে খাওয়া যায় না। যে হলে তিনি থাকেন, যে ডাইনিংয়ের সরঞ্জাম কেনা হয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থে, সেখানেই তিনি অচেনা, অনাহূত।
এই দৃশ্য একদিনের নয়, একজনের গল্পও নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় আবাসিক হল শাহ আমানতে প্রতিদিন এমন হাজারো ছাত্র ফিরে যান খালি হাতে। হলটিতে আবাসিক ছাত্র ৬০০ জন, সংযুক্ত আরও প্রায় তিন হাজার- মোট সাড়ে তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর একটি জনগোষ্ঠী। অথচ ডাইনিংয়ে খেতে পারেন মাত্র ৮০ থেকে ১০০ জন। বাকি সবার জন্য দরজা কার্যত বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহ্যবাহী হলের ডাইনিং যেন রূপান্তরিত হয়ে গেছে ৭০-৮০ জনের এক ‘ফিক্সড ক্লাবে’।
এক পক্ষের হাতে জিম্মি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ
সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দেয় বৈষম্যের গভীরতা। সরেজমিনে দেখা গেছে, শাহ আমানত হলের ডাইনিংয়ে কর্মরত আছেন ১৫ জন- বাবুর্চি, সহকারী বাবুর্চি, ভোজনালয় সহকারী, সব পদই পূর্ণ। রান্নার সক্ষমতা এক হাজার ছাত্রের। হাঁড়ি-পাতিল, প্লেট-বাটি, তিনটি বড় রেফ্রিজারেটর- সবকিছুই কেনা হয়েছে সরকারি বরাদ্দে। কিন্তু এই বিশাল অবকাঠামো ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৮০-১০০ জনের জন্য। বাকি প্রায় সাড়ে তিন হাজার ছাত্রের কাছে এই সুবিধা যেন অস্তিত্বহীন।
কীভাবে ঘটল এমন পরিস্থিতি? অভিযোগ, ডাইনিং চালাচ্ছে ছাত্রদের একটি নির্দিষ্ট পক্ষ, নিজেদের বানানো নিয়মে। মাসের শুরুতে বাজারের টাকা অগ্রিম জমা দিতে হয়- নগদ টাকায় খাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যার অর্থ, ক্লাস শেষে হলে ফেরা সংযুক্ত ছাত্ররা, যাদের হাতে হয়তো সেদিনের খাবারের টাকা আছে, তারাও খাবার পান না। মাসের শুরুতে অগ্রিম না দিলে পুরো মাসই উপোস থাকতে হয়।
একজন ভুক্তভোগী সংযুক্ত ছাত্র এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, “আমরা হলের ছাত্র। ডাইনিং আমাদের অধিকার। মাসের ১ তারিখে টাকা দিতে না পারলে ৩০ দিন উপোস থাকব-এটা কোনো নিয়ম?” তার ভাষ্যে ফুটে ওঠে গভীর অসহায়ত্ব- হল প্রভোস্ট ও হাউস টিউটরদের কাছে বহুবার অভিযোগ জানানো হলেও ছাত্রদের এই পক্ষের চাপে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।
স্টাফের প্রভাব-বদল আর প্রশাসনের অসহায়ত্ব
এই সংকটের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আব্দুল আলী নামের এক সহকারী বাবুর্চির নাম। অভিযোগ, তিনি আগে ডাইনিংয়ের বাজার করতেন এবং ম্যানেজারকে দিয়ে করাতেন অতিরিক্ত ব্যয়। এমনকি বিজয় দিবসের রান্নায়—এক টুকরা মুরগি, একজনের পোলাও, একজনের মুগডাল—এই সামান্য আয়োজনেই জনপ্রতি শুধু তেল-মসলার বিল ধরা হয়েছিল ৫৯ টাকা। তার প্রভাবের কারণে অন্য কোনো স্টাফ ডাইনিংয়ের বাজার-ব্যয়ে বিনিয়োগ করতে রাজি হচ্ছেন না।
আরও উদ্বেগজনক হলো তার রাজনৈতিক আশ্রয়-বদলের ধরন। অভিযোগ অনুযায়ী, আব্দুল আলী আগে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটাতেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াতের, আর এখন খাটাচ্ছেন বিএনপির প্রভাব। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখার এই কৌশল প্রশ্ন তোলে- প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা কতটা দুর্বল হলে একজন কর্মচারী পরপর তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ছায়ায় নিজের প্রভাব ধরে রাখতে পারেন। ডাইনিংয়ের পরিস্থিতি নোংরা করে ফেলার পর কয়েক মাস ধরে তিনি নাকি নিজের পছন্দের ক্যান্টিনে বদলির তদবির করছেন, যেখানে দায়িত্ব মাত্র একবেলার। অথচ ডাইনিংয়ের ম্যানেজার হচ্ছেন না নিজে, আবার অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতেও বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ। এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় আব্দুল আলীর সঙ্গে। কিন্তু তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান অবশ্য বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তার ভাষ্যে, তিনি প্রভোস্ট হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই ছাত্ররা নিজেদের সুবিধার্থে মিল সিস্টেম চালু করেছিল। কারণ জানতে চাইলে তাকে বলা হয়েছিল, ডাইনিংয়ের বাজারের জন্য ৩০-৪০ হাজার টাকার বেশি পুঁজি প্রয়োজন, যা আগে দুয়েকজন স্টাফ বিনিয়োগ করতেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে তারা এই বিনিয়োগে রাজি হচ্ছেন না, আর স্টাফদের বাধ্য করারও কোনো আইনগত সুযোগ প্রশাসনের নেই। তার দাবি, স্টাফরা যখন চালাতেন তখনো নিম্নমানের খাবার ও অনিয়ম দেখা যেত। তাই ছাত্ররাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের টাকায় মিল সিস্টেম চালু করেন।
সমস্যা সমাধানে প্রশাসন একটি বিকল্প ব্যবস্থাও করেছে বলে জানান প্রভোস্ট—পশ্চিম পাশের একটি ডাইনিং তাৎক্ষণিকভাবে ক্যান্টিন হিসেবে বেসরকারি উদ্যোক্তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, বসানো হয়েছে সাবমার্সিবল পাম্প, রং করা হয়েছে পুরো জায়গা, ফ্যান-লাইট-চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সেখানে এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খাবার মেলে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়- সরকারি বরাদ্দে কেনা মূল ডাইনিংয়ের ভবিষ্যৎ কী, আর কেন সেটি এখনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষের নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সাড়ে তিন হাজার ছাত্রের প্রশ্ন: দায়িত্ব কার
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হল অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও ডাইনিং থেকে খাবার নিতে গেলে ওই পক্ষের রোষানলে পড়ার শঙ্কায় থাকেন বলে অভিযোগ। টাকা হাতে থাকা সত্ত্বেও কেউ খাবার কিনতে পারছেন না। ছাত্রদের ভাষায়, ডাইনিং আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ নেই- এটি পরিণত হয়েছে এক পক্ষের ‘দখলদারি সম্পত্তিতে’।
এখানেই উঠে আসে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নগুলো। সরকারি টাকায় কেনা সরঞ্জাম আর বেতনভুক্ত ১৫ জন কর্মী দিয়ে যদি মাত্র ৮০-১০০ জন খেতে পারেন, তাহলে বাকি সাড়ে তিন হাজার ছাত্রের খাওয়ার দায়িত্ব নেবে কে? হল অফিসের লোকেরাই যদি ডাইনিং থেকে খাবার নিতে না পারেন, তাহলে সাধারণ ছাত্র যাবেন কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী হলের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ যদি একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণেই আটকে থাকে, তাহলে প্রশাসনের ভূমিকা আসলে কোথায়?
ছাত্রদের দাবি স্পষ্ট- ডাইনিং সবার জন্য খুলে দিতে হবে। কিন্তু মাসের পর মাস আলোচনা চলার পরও যেখানে সমাধান আসেনি, সেখানে প্রশ্ন থেকে যায়—এই বৈষম্যের অবসান ঘটাতে প্রশাসনের কাছে সদিচ্ছার পাশাপাশি সাহসও কি যথেষ্ট আছে? নাকি এক পক্ষের চাপের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব বারবার নতিস্বীকার করেই যাবে, আর সাড়ে তিন হাজার ছাত্র প্রতিদিন খালি হাতে ফিরবেন?
