- পলি দত্ত ও ইফা শীল (ডানে)
তুলির বয়স মাত্র ছয়। সে এখনো বোঝেনি মৃত্যু কী জিনিস। মায়ের জন্য অপেক্ষায় বসে আছে সে। টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া। মা বলে গিয়েছিলেন, “রাতে এসে খাইয়ে দেব।” তুলি প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করছে, “আমার মা এখনো কেন ঘুমাচ্ছে? মা কখন উঠবে?”
মা আর উঠবেন না।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাত ৮টায় আনোয়ারার টানেল সংযোগ মোড়ে পলি দত্ত সিএনজির অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন। হাতে বাজারের ব্যাগ, ভেতরে তুলির জন্য মিষ্টি আর ১০ বছরের অন্তুর জন্য নতুন খাতা। ঘরে ফেরার তাড়া। ঠিক সেই মুহূর্তে ধেয়ে এলো এক ঘাতক বাস।
দানবীয় বাসে পিষ্ট হলো দুটি জীবন
চাতরী চৌমুহনী বাজারসংলগ্ন কর্ণফুলী টানেল সংযোগ মোড়ে সেই রাতে লাইনে ছিল ৬টি সিএনজি ও রিকশা। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে মানুষ। সবাই স্বাভাবিক। ঘরে ফেরার অপেক্ষায়।
টানেল সড়ক থেকে বেপরোয়া গতিতে ধেয়ে আসা বাসটি মুহূর্তেই পিষে দিল সারিবদ্ধ যানগুলো, তারপর ঢুকে পড়ল চায়ের দোকানে। হাড়গোড় ভাঙার শব্দ, বাঁচার আর্তনাদ— তারপর রক্তের সাগর।

পলি দত্তের বাজারের ব্যাগ ছিটকে পড়ল দূরে। নতুন খাতাগুলো রক্তাক্ত হয়ে লেপ্টে গেল পিচের রাস্তায়। মিষ্টির প্যাকেট ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল রক্তের মধ্যে। যে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ আগে সন্তানদের জন্য মিষ্টি কিনছিলেন, সেই হাত তখন নিস্পন্দ।
একই দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলেন ৪০ বছর বয়সী ইফা শীলের। তিনি এসেছিলেন অসুস্থ স্বামী শিমুল শীলকে ডাক্তার দেখাতে। ওষুধ কিনে বাড়ি ফেরার পথে টানেল মোড়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অসুস্থ স্বামীকে পেছনে নিরাপদে রেখে সিএনজির খোঁজে একটু এগিয়েছিলেন তিনি। ঠিক তখনই বাসটি এলো।
সবকিছু থেমে যাওয়ার পর শিমুল শীল দেখলেন— ইফা নিথর। তাঁর হাতের মুঠোয় তখনো শক্ত করে ধরা স্বামীর ওষুধের প্যাকেট আর প্রেসক্রিপশন। ইফার নিজের রক্তে লাল হয়ে গেছে স্বামীর জীবন বাঁচানোর সেই ওষুধগুলো।
- নিহত ইফা শীলের মা ও মেয়ে।
হাসপাতালে আহাজারি, মোড়ে আগুন
আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের করিডোর আজ শুধুই কান্নার রোল। পলির স্বামী সুব্রত দত্ত পাথর হয়ে বসে আছেন। আর হাসপাতালের বারান্দায় বসে পাগলপ্রায় শিমুল শীল বিলাপ করছেন, “আমাকে ভালো করতে এসে তুমি নিজে কেন চলে গেলে? এখন আমাকে কে ওষুধ খাইয়ে দেবে? কার দিকে চেয়ে বাঁচব?”
এদিকে ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সকাল থেকে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় মানুষ। চাতরী চৌমুহনী ও টানেল মোড়ে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে টানেল সংযোগ সড়ক অবরোধ। প্ল্যাকার্ডে লেখা— “খুনি চালকের ফাঁসি চাই”, “সড়ক কি মৃত্যুর ফাঁদ?”
স্থানীয় তরুণ সংগঠক ইকবাল হোসাইন বলেন, “টানেল হওয়ার পর থেকে এই মোড়টি চরম ঝুঁকিপূর্ণ। দূরপাল্লার বাসগুলো রেষারেষি করে, ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণ নেই। আমাদের মা-বোনদের এভাবে রাস্তায় মরতে দেব না।”
বিক্ষুব্ধ জনতার তিনটি দাবি— পলাতক চালক ও হেলপারকে দ্রুত গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি, টানেল মোড়ে স্থায়ী স্পিড ব্রেকার ও পর্যাপ্ত বাতি স্থাপন এবং স্থায়ী ট্রাফিক পুলিশ বক্স বসানো। ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে।
আনোয়ারা থানার ওসি মো. জুনায়েত চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনার পরই চালক ও হেলপার পালিয়ে গেছে। বাস ও অটোরিকশাগুলো জব্দ করা হয়েছে। একাধিক পুলিশ টিম অপরাধীদের গ্রেফতারে কাজ করছে।
পলি দত্তের খাতা আর মিষ্টির প্যাকেট, ইফা শীলের ওষুধের পাতা— এই দুটি দৃশ্য বলে দেয় সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতে চাওয়া দুজন সাধারণ মানুষের গল্প। তাঁরা শুধু ঘরে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটি বেপরোয়া বাস সেই অধিকারও কেড়ে নিল। তুলি এখনো মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। শিমুল শীল এখনো বুঝতে পারছেন না কে তাঁকে এখন ওষুধ খাইয়ে দেবে।


