অনুসন্ধিৎসু চোখ


আনোয়ারায় আমার বাসায় একটা তাক আছে, বইয়ে ঠাসা। বেশিরভাগ বই কখনো খোলাই হয় না, ধুলো জমে। কিন্তু একটা বই মাঝেমধ্যেই নামিয়ে আনি, বিশেষ করে যেদিন লেখাটা এগোতে চায় না, হাত কাঁপে, মনে হয় এই প্রতিবেদন প্রকাশ করলে বিপদ আসবে। বইয়ের প্রথম পাতায় কালো কালিতে লেখা-

“মফস্বল সাংবাদিকতার অনুসন্ধিৎসু চোখ, স্নেহভাজন জিন্নাত আয়ুব। শুভেচ্ছা-দোয়াসহ, আজাদ তালুকদার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রি:”

পাঁচ বছর হয়ে গেল, তবু এই কটা লাইন পড়লে বুকের ভেতরটা আজও একইভাবে কাঁপে।

২০১৬ সালে যখন একুশে পত্রিকা পরিবারে যুক্ত হই, তখন সাংবাদিকতার কোনো সার্টিফিকেট ছিল না আমার হাতে। ছিল শুধু জানার একটা অস্থিরতা, আর কতগুলো কাঁচা প্রশ্ন। স্যার সেই কাঁচা হাতটাকেই ধরলেন। কীভাবে একটা সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ হয়, কীভাবে সত্যকে সাহসের সাথে লেখা যায়- সবকিছু তিনি হাতে-কলমে শিখিয়েছেন, যেন একজন কারিগর যত্ন করে একটা কাঁচামালকে ঘষেমেজে আকার দিচ্ছেন।

স্যার কাজের ব্যাপারে ছিলেন কড়া, আপসহীন। ভুল হলে অনেক সহকর্মীকেই তিনি কড়া কথা শোনাতেন। কিন্তু আজও অবাক লাগে, আমাকে তিনি কোনোদিন একটা বকাও দেননি। বকা নয়, তিনি আমাকে জড়িয়ে রাখতেন এক আশ্চর্য স্নেহের চাদরে। কেন, তা আজও ব্যাখ্যা করতে পারি না। শুধু জানি, ওই স্নেহটুকুর ভেতর দিয়েই আমি প্রথম বুঝেছিলাম, সাংবাদিকতা মানে শুধু ভয় জয় করা নয়, কারো পাশে থাকাও।

তাঁর সাথে আমার সম্পর্কটা শুধু পেশার সীমানায় থাকেনি। কখনো কখনো, যখন তাঁর মনটা ভার হয়ে থাকত, তিনি আমাকে ফোন করতেন, তারপর গাড়ি নিয়ে ছুটে আসতেন আনোয়ারায়। পারকি সমুদ্র সৈকতের বালুতে হাঁটতে হাঁটতে, কিংবা কেইপিজেডের পাশ দিয়ে, অথবা উপজেলার পুরনো পুকুরঘাটে বসে তিনি হালকা করতেন নিজের মন। ঢেউয়ের শব্দে, পুকুরের স্থির জলে বসে তিনি বলে যেতেন জীবনের নানা গল্প, আমি চুপচাপ শুনতাম। একজন সম্পাদক তাঁর প্রতিনিধির কাছে এসে মন হালকা করছেন- এই দৃশ্যটা যতবার মনে পড়ে, ততবার বুঝি, তিনি আসলে কতটা একা ছিলেন, আর কতটা বিশ্বাস করতেন আমাকে।

জীবনের প্রতিটা বিপদে তিনি আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন বটবৃক্ষের ছায়ার মতো। যখনই কোনো প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে ভয় পেয়েছি, ক্ষমতাবান কারো নাম চলে এসেছে কলমের ডগায়, তখনই স্যারের সেই কথাটা কানে বাজত- “জিন্নাত, সংবাদের উপাদান বা সত্য যতই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যাক না কেন, তুমি নির্ভয়ে লিখ। পিছু হটো না, মনে রাখবে পেছনে আমি আছি।” এই একটা বাক্য আমার সব ভয়ের ওষুধ ছিল। বলতেন, “জিন্নাত, তোমাকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম জনপদে আমি এক সাহসী সংবাদকর্মী হিসেবে দেখতে চাই।” আজ যদি “জিন্নাত আয়ুব” নামে কোনো পরিচয় আমার থাকে, তার পুরোটাই স্যারের সেই স্বপ্নের প্রতিধ্বনি।

চট্টগ্রামের অফিসে বসে থাকতেন রুকন ভাই, স্যার যাকে আদর করে ডাকতেন “ম্যাজিকম্যান”। আমাদের কাঁচা লেখাগুলো তিনি যত্ন করে দেখতেন, শুধরে দিতেন। স্যার নেই, কিন্তু সেই যত্নটুকু আজও একইভাবে বহাল আছে। আর পত্রিকাটাকে, নিজের সন্তানের মতোই, স্যার মৃত্যুর আগে তুলে দিয়ে গেছেন নজরুল কবির দীপু স্যারের হাতে। দীপু স্যার আজও সেই আমানত বুকে আগলে রেখেছেন।

শেষবার স্যারকে দেখেছিলাম ২০২৩ সালের ২১ জুলাই, ঢাকার বিআরবি হাসপাতালে। খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলাম। কেবিনে ঢুকে যে মানুষটাকে দেখলাম, তাঁকে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। মাথায় চুল নেই, হাতে ক্যানোলা, শরীর ভীষণ ক্ষীণ। অথচ চোখ দুটো তখনো সজাগ, স্মৃতি তখনো তীক্ষ্ণ। ডাক্তার-নার্সের ভিড়ের মাঝেও তিনি কাউকে দিয়ে একটা নিউজের খুঁটিনাটি লিখিয়ে নিচ্ছিলেন- কার নাম, কার পদবি, কোনটা আগে যাবে, কোনটা পরে। মৃত্যুশয্যাতেও পত্রিকার কথা ভুলতে পারেননি মানুষটা। সেদিন বুঝেছিলাম, “অনুসন্ধিৎসু চোখ” কথাটা তিনি শুধু আমাকে উপহার দেননি, নিজেও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সেই চোখ দিয়েই পৃথিবীটা দেখে গেছেন।

তারপর এলো সেই ২ আগস্ট। ভোররাতে খবরটা এলো, আর পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে মন চায়নি, তবু ছুটে যেতে হলো রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়ায়, যেখানে বাবার কবরের পাশে তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হলো। সেদিন আকাশও কেঁদেছিল আমাদের সাথে।

তিন বছর পার হয়ে গেছে। আজও যখন কোনো কঠিন প্রতিবেদন লিখতে বসি, হাত একটু কাঁপে, তখন বের করি সেই বইটা। প্রথম পাতা খুলি। কালো কালির অক্ষরগুলো তখনো একইভাবে বলে ওঠে- নির্ভয়ে লিখ, পিছু হটো না, পেছনে আমি আছি। জানি, এটা শুধু কালি আর কাগজ। তবু প্রতিবার মনে হয়, স্যার সত্যিই আছেন, ঠিক পেছনেই, ওই অনুসন্ধিৎসু চোখ দিয়ে আমার লেখাটা পড়ছেন।

স্যার, যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন। আপনার দেওয়া চোখ দিয়েই আমি দক্ষিণ চট্টগ্রামের মাটি দেখে যাব, যতদিন কলম চলে।

লেখক : আনোয়ারা-কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি, একুশে পত্রিকা।