যে ডাক আজও থামেনি


রাত বারোটার পর আজকাল আমার ফোনটা আর বাজে না।

একটা সময় ছিল, এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি সজাগ থাকতে হতো। স্ক্রিনে ভেসে উঠত একটাই নাম- “আজাদ ভাইয়া”। ওপাশ থেকে গলাটা চড়া, তাড়া দেওয়া। কিন্তু আমার ওপর তিনি কোনোদিন রাগ দেখাননি- বরং স্নেহ করতেন, আমার কথার গুরুত্ব দিতেন সবসময়। “রুকন, কালকে এই বিষয়ে একটা লেখা চাই। ঘুমাইও না, লিখে ফেলো।” রাত একটা, দেড়টা, কোনো কোনো দিন দুইটাতেও ফোন বেজে উঠত। আমি বিরক্ত হইনি কোনোদিন। বরং টের পেতাম, ওই ডাকটাই আমাকে জাগিয়ে রাখত সাংবাদিকতায়।

তিন বছর হয়ে গেল, সেই ডাকটা আর আসে না। অথচ আজও রাত বারোটার পর ফোন বাজলে বুকের ভেতর একটা লাফ দিয়ে ওঠে পুরনো অভ্যাসে। তারপর মনে পড়ে, ওই নম্বরে আর কেউ নেই।

দুই.

২০১৩ সালের কোনো একদিন প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। তখনও জানতাম না, এই মানুষটা একদিন আমার জীবনের দিক বদলে দেবেন। সত্যিকারের পরিচয় জমাট বাঁধে ২০১৫ সালে, ৮ জুনের এক সন্ধ্যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে। সূর্যমুখী তেলের একটা চালানের আড়ালে কোকেন ধরা পড়েছে, খবরটা তখন সবে ছড়াচ্ছে। আমি তখন বাংলামেইলে কাজ করি, বন্দরের ভেতরে দাঁড়িয়ে টিভি ক্যামেরার ভিড়ে হাঁসফাঁস করছি। আজাদ ভাইয়া তখন একাত্তর টিভির হয়ে ঘটনাটা কাভার করছেন।

ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখ আটকে গেল এক চেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তার দিকে। তাঁর ইশারায় কাছে গেলাম। ফিসফিস করে যা শুনলাম, তাতে বুকের ভেতর একটা দমক উঠল- কতজন আটক, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে কোথায়। সেই মুহূর্তে সাংবাদিকদের ভিড়ে আমি একাই জানি খবরটা।

আজাদ ভাইয়ার কানের কাছে গিয়ে কথাটা বলেছিলাম, নিচু গলায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি সেটা একাত্তর টিভির লাইভে জানিয়ে দিলেন। সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরলেন, সূত্র জানতে চাইলেন। তিনি পাথরের মতো চুপ। আমার নাম বলেননি, একবারও না। তখনই বুঝেছিলাম, এই মানুষটা যা রক্ষা করার কথা দেন, তা রক্ষা করেন।

সেদিনের সেই নীরবতাই ছিল আমাদের সম্পর্কের প্রথম ইট।

তিন.

সেই বছরের শেষদিকে একদিন আজাদ ভাইয়া বললেন, একুশে পত্রিকার একটা অনলাইন সংস্করণ করবেন। কাগজে একুশে পত্রিকা তখন ২০০৪ সাল থেকেই আছে, প্রথমে মাসিক, পরে সাপ্তাহিক হিসেবে বেরোচ্ছিল। তিনি চাইলেন সেটাকে অনলাইনেও নিয়ে যেতে, নাম দিলেন একুশে পত্রিকা ডটকম। তখনো কোনো অফিস নেই, লোকবল নেই, আছে শুধু একটা স্বপ্ন আর একটা ডোমেইন কেনার সাহস। তখন আমি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশে কাজ করি, তবু মন পড়ে থাকত এই নতুন স্বপ্নটায়। পরে দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদে যোগ দিলাম, কিন্তু একুশে পত্রিকার টান কোনোদিন কমেনি। আজ একুশে পত্রিকা ডটকম একটি নিবন্ধিত অনলাইন পত্রিকা- সেই স্বপ্নেরই ফসল।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে অবশেষে সেই ডাকে পুরোপুরি সাড়া দিলাম। সেদিন থেকে আজাদ ভাইয়া আমার কাছে শুধু সম্পাদক থাকলেন না, হয়ে উঠলেন বড় ভাই- যাঁর স্নেহ আর যাঁর ভরসা, দুটোই একসঙ্গে বহন করতে শিখেছিলাম।

চার.

একুশে পত্রিকাকে তিনি সন্তানের মতো দেখতেন। রাত-দিন এক করে কাজ করতেন, চা আর চানাচুর দিয়ে দিন পার করতেন, ভাত খেতে ভুলে যেতেন প্রায়ই। আমরা যারা কাছ থেকে দেখেছি, জানি- এই অবহেলাই হয়তো একদিন তাঁর শরীরে বাসা বাঁধতে দিয়েছিল ক্যানসারকে।

তিনি প্রায়ই বলতেন, “সংবাদের উপাদান যদি আবার বাবাও হয়, তাকেও ছাড় দেওয়া যাবে না।” ক্ষমতাবান কারও সামনে মাথা নোয়াননি কোনোদিন, নতজানু সাংবাদিকতার বিপরীতে হেঁটেছেন সবসময়। এই সাহসের দাম তাঁকে অনেকবার দিতে হয়েছে, তবু পিছু হটেননি। তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন এক সাংবাদিকতার, যা সমাজের আনাচকানাচে সত্যিকারের বদল আনবে- আজ একুশে পত্রিকার প্রতিনিধিরা যে “ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম” চর্চা করেন, প্রতি মাসে যে সেরা ইমপ্যাক্ট জার্নালিস্ট সম্মাননা দেওয়া হয়, তার বীজ তিনিই বুনে গিয়েছিলেন।

পাঁচ.

এই সাহসটুকু বোধহয় তাঁর রক্তেই ছিল। তাঁর মা জাহান আরা বেগম সত্তরের দশকে, যখন নারীদের ঘর থেকে বেরোনোটাই ছিল সমাজের চোখে অন্যায়, তখন টানা পনেরো বছর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হিসেবে নারীর অধিকারের কথা বলে গেছেন। বাবা খায়ের আহমেদ তালুকদার নিজের সর্বস্ব দিয়ে গড়েছেন স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। সেই উত্তরাধিকারই বোধহয় আজাদ ভাইয়াকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছিল করোনাকালের সেই দুঃসাহসী কাজ- মাত্র চৌদ্দ দিনে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা চট্টগ্রামের প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল, যখন মানুষ চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে দিশেহারা। বাবা-মায়ের নামে গড়া খায়ের জাহান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকতে রাঙ্গুনিয়ার মানুষ পেয়েছিল স্বাস্থ্যসেবা।

ছয়.

লিভার ক্যানসার ধরা পড়ার পর প্রতিবার বিদেশযাত্রার আগে তিনি আমাকে বাসায় ডেকে নিতেন। সবকিছু বুঝিয়ে দিতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। বলতেন, “তুমি আমার ভরসা।” আমিও চেষ্টা করতাম তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে, যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে পত্রিকার কাজে একটুও চাপ না পড়ে। এই কথা তিনি অন্যদের কাছেও গর্ব করে বলতেন। সেই গর্বটুকুই ছিল আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতাল থেকে ঢাকার বিআরবি হাসপাতাল- বছরের পর বছর এই যাতায়াতে তিনি ক্লান্ত হননি একবারও মুখে। কিন্তু ক্যানসারের সঙ্গে এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি একাই লড়েছেন।

সাত.

শেষ দিনগুলোয় বিআরবি হাসপাতালের কেবিনে যে মানুষটাকে দেখেছি, তিনি আমার চেনা আজাদ ভাইয়া নন। যাঁর গলা সবসময় ছিল সিংহের গর্জনের মতো, রাগে কাঁপত ঘরের দেয়াল, সেই গলা তখন নেমে এসেছিল ফিসফিসে। কাজের কথা নেই, অ্যাসাইনমেন্টের তাড়া নেই। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকা, আর মাঝে মাঝে দুর্বল হাতের একটা স্পর্শ।

চড়া গলার মানুষটার এই নরম হয়ে যাওয়া আমাদের ভেতরটা ভেঙে দিয়েছিল সবচেয়ে বেশি। যাঁকে কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি, তাঁকেই যখন এত ভঙ্গুর দেখলাম, বুঝেছিলাম- সময় ফুরিয়ে আসছে।

আট.

২ আগস্ট, ২০২৩। ভোররাত ৪টা ১১ মিনিট। ফোনটা যখন বাজল, আমি জানতাম, ভালো খবর নয়। তবু বিশ্বাস করতে মন চায়নি।

সেদিন একুশে পত্রিকা অনলাইনে তাঁর শোকসংবাদটা লিখতে বসেছিলাম নিজের হাতে। কি-বোর্ডে আঙুল রাখতেই মনে হচ্ছিল, নিজের হাতেই যেন একটা কবর খুঁড়ছি। কী লিখছি, কেন লিখছি- কিছুই গুছিয়ে ভাবতে পারছিলাম না। বাইরে তখন চট্টগ্রামের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে অঝোরে, যেন শহরটাও কাঁদছে তাঁর জন্য।

জামালখান জামিয়াতুল ফালাহ মসজিদ, প্রেস ক্লাব চত্বর, আর সবশেষে রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়া- তিন তিনটে জানাজা পেরিয়ে বাবার কবরের পাশে তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হলো। যে মাটিতে তিনি জন্মেছিলেন, সেই মাটিই তাঁকে ফিরিয়ে নিল নিজের কোলে।

নয়.

তিন বছর কেটে গেছে। সাপ্তাহিক একুশে পত্রিকা এখনো নিয়মিত বেরোচ্ছে, একুশে পত্রিকা ডটকমও প্রতিদিন আপডেট হচ্ছে, চট্টগ্রামের মানুষকে খবর দিচ্ছে, তৈরি করছে বাস্তব ইমপ্যাক্ট। যে হাতে তিনি পত্রিকাটা গড়েছিলেন, সেই হাতগুলোর অনেকগুলোই আজও কলম ধরে আছে তাঁরই শেখানো নিয়মে। প্রতি বছর এই দিনে সহকর্মী, স্বজন আর শুভানুধ্যায়ীরা একত্র হন দোয়া মাহফিলে, তাঁকে স্মরণ করতে।

তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরই ইচ্ছা অনুযায়ী একুশে পত্রিকার দায়িত্ব নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নজরুল কবির দীপু ভাইয়া। নানা চ্যালেঞ্জ আর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেক কষ্ট করে আজও তিনি এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, কঠিন সময়ে শক্ত হাতে হাল ধরে আছেন। সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে তিনিই আমাদের পথ দেখান, তাঁর ছায়াতেই আমরা কাজ করি, তাঁর হাত ধরেই একুশে পত্রিকা এগিয়ে যাচ্ছে। দীপু ভাইয়া না থাকলে এই পথচলা টিকিয়ে রাখা এত সহজ হতো না। তিনি আমাদের সবার মাথার ওপর ছায়া হয়ে আছেন।

আজাদ ভাইয়ার লেখায় এক ধরনের জাদুবাস্তবতা ছিল- বাস্তবতাকে তিনি মিশিয়ে দিতেন কল্পনার সঙ্গে, খুব সহজ কথায় বলে ফেলতেন অসাধারণ কিছু। আজ যখন তাঁকে নিয়ে লিখতে বসি, মনে হয় সেই শেখাটাও তিনি রেখে গেছেন আমাদের জন্য- সত্যকে শুধু বলা নয়, সেটাকে অনুভব করানোও সাংবাদিকতার কাজ।

দশ.

রাত বারোটার পর আজকাল আমার ফোনটা আর বাজে না।

তবু মাঝেমধ্যে, ঠিক মাঝরাতে, ফোনটা এমনি এমনি একবার কেঁপে ওঠে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি, কেউ নেই, কোনো নোটিফিকেশন নেই। তবু মনে হয়, সেই কাঁপনটা আসলে একটা ডাক।

আজাদ ভাইয়া, আপনার ডাক থামেনি। শুধু নম্বরটা বদলে গেছে। এখন সে ডাক আসে বিবেক থেকে- যখনই সত্য বলার সময় আসে, যখনই মাথা নোয়ানোর প্রলোভন আসে সামনে, তখনই ভেতর থেকে সেই চেনা গলাটা শুনতে পাই- “রুকন, লিখে ফেলো।”

আমরা লিখে যাচ্ছি। আপনার শেখানো নিয়মেই।

লেখক : প্রধান প্রতিবেদক, একুশে পত্রিকা।