
রাত অনেক। ফোনের স্ক্রিনে একুশে পত্রিকার আপডেটগুলো একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম, কোথাও কোনো ভুল থেকে গেল কিনা। ঘরের বাকি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ, শুধু ফোনের নীল আলোয় জেগে আছি আমি। এমন সময় দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসে ফজরের আজান, দীর্ঘ, সুরেলা। হাতের কাজটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। মনে পড়ে যায় আজাদের কথা, আর তার সাথে জড়িয়ে থাকা সেই পুরনো দিনগুলোর কথা।
১৯৯০ সাল। স্কুলের সেই সোনালি দিনগুলোয় আজাদের সাথে আমার বন্ধুত্বের সুতোটা গাঁথা হয়েছিল। ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে দুজনে ফিসফিস করে গল্প করতাম, টিফিনের ছুটিতে একই পাত্র থেকে মুড়ি খেতাম, স্কুল ছুটির পর মাঠে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। তখন বুঝিনি, দুটো আলাদা মানুষের ভেতরে এতটা মিল থাকা সম্ভব। ওর যা ভালো লাগত, আমারও তা-ই লাগত। ওর যেখানে রাগ হতো, আমারও সেখানে রাগ হতো। যেন দুটো আলাদা তার একই সুরে বাঁধা- একজন টোকা দিলে অন্যজনও কেঁপে উঠত। হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, সবকিছুতেই আমরা ছিলাম একে অপরের প্রতিধ্বনি।
সেই সুরটাই পরে বেজেছিল একুশে পত্রিকার প্রতিটা পাতায়। সাতাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আজাদ সাংবাদিকতার আকাশে নিজের আলো ছড়িয়েছে- একাত্তর টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, তারপর নিজের হাতে গড়া একুশে পত্রিকা। শুধু খবরের কাগজেই থামেনি সে। প্রশাসনিক নানা কমিটিতে নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছে, করোনাকালে মাত্র চোদ্দ দিনে গড়ে তুলেছে চট্টগ্রামের প্রথম বেসরকারি ফিল্ড হাসপাতাল, বাবা-মায়ের নামে খায়ের জাহান ফাউন্ডেশন করে নিজ এলাকার মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে। এত কিছুর মধ্যেও তার কলম কখনো মাথা নোয়ায়নি। একুশে পত্রিকার নিজস্ব একটা স্লোগানই তো ছিল তার- “নিউজের উপাদান যদি আমার বাবাও হয়, তাকেও ছাড় নেই।” এই একটা বাক্যেই আজাদকে চেনা যায় সম্পূর্ণ।
২০২৩ সালের জুলাইয়ের সেই দিনটার কথা আজও ভুলিনি। রাজধানীর বিআরবি হাসপাতালের কেবিনে ঢুকতেই বুকটা হু হু করে উঠেছিল। আজাদ, আমার প্রাণের বন্ধু, ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, “নজরুল, তুই এসেছিস?” আমার চোখের পানিও তখন বাঁধ মানছিল না। দু’জনের কান্নায় যেন কেবিনটা ভেসে যাচ্ছিল। এতটা কষ্ট, এত বেদনা- বাবাকে হারানোর সময়ও এমন কান্না পায়নি আমার। হয়তো বাবার মৃত্যুটা বার্ধক্যজনিত বলে মেনে নিতে পেরেছিলাম, আজাদেরটা কিছুতেই নয়। পাশে ছিলেন দেলোয়ারা আপা, তিনিই আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে খাটে বসালেন। কিন্তু আজাদকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পাইনি সেদিন।
একমাত্র ছেলে অর্ঘ্যকে নিয়ে আজাদের কত স্বপ্ন ছিল। চেয়েছিল ছেলেটা সুশিক্ষিত হবে, প্রতিষ্ঠিত হবে। ক্যানসার সেই স্বপ্নগুলোকে গুঁড়িয়ে দিল। শেষ সময়ে বারবার অর্ঘ্যের কথা বলত, আর একুশে পত্রিকাকে বাঁচিয়ে রাখার আকুতি জানাত। কথা দিয়েছিলাম, যতদিন বুকে প্রাণ আছে, তার শেষ ইচ্ছাটা পূরণের চেষ্টা করে যাব।
মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ফোনে শেষবার কথা হলো। কণ্ঠটা কাঁপছিল, দুর্বল হয়ে আসছিল ক্রমশ, যে গলায় এতদিন আদেশের সুর ছিল, সেই গলাতেই তখন শুধু ক্লান্তি। তবু বলেছিল, “নজরুল, তুই আমার পাশে থাক।” বুক চাপড়ে বলেছিলাম, “আমি সবসময় তোর পাশেই আছি।” কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি আমাকে আর তার কাছে যেতে দেয়নি। এই একটা আক্ষেপ বোধহয় কোনোদিন মিটবে না- শেষ মুহূর্তে পাশে থাকতে চেয়েও থাকা হলো না। কথা রাখতে না পারার এই গ্লানি নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে বাকি জীবন।
২ আগস্ট, ভোর থেকেই চট্টগ্রামের আকাশ কেঁদেছিল গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে, বেলা বাড়তে বাড়তে সেই বৃষ্টি রূপ নিয়েছিল ঝুম বর্ষণে। সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়ায় যখন তাকে মাটি দেওয়া হচ্ছিল, আমিও ছিলাম সেখানে। ভিড়ের মধ্যে চেনা-অচেনা অনেকের সাথে দু-একটা কথা হলো, সমবেদনা জানালেন কেউ কেউ। কিন্তু ভেতরটা তখন এক অচেনা নীরবতায় ডুবে গেছে। যে সুরে এতদিন দুটো জীবন বাঁধা ছিল, সেই সুরটাই থেমে গেল সেদিন, বৃষ্টির শব্দের ভেতর দিয়ে।
আজাদের একটা স্বপ্ন ছিল, এমন এক সাংবাদিকতা, যা সমাজের আনাচে-কানাচে সত্যিকারের বদল আনবে। সেই স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখতেই এখন প্রতি মাসে একুশে পত্রিকার প্রতিনিধিদের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হয় সেরা “ইমপ্যাক্ট জার্নালিস্ট”, যাঁর প্রতিবেদন সত্যিই কোনো একটা জায়গায় বদল এনেছে। ক্রেস্ট আর সনদ তুলে দেওয়ার সময় প্রতিবারই মনে হয়, আজাদ যেন পাশেই দাঁড়িয়ে দেখছে, মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে।
তিন বছর হয়ে গেল। প্রতিদিন অফিসে যাওয়া হয় না আমার, কিন্তু একুশে পত্রিকার কোনো দিনই আমার নজর এড়ায় না। ফোনে, ল্যাপটপে, রাত-বিরাতে মেসেজে মেসেজে দিক ঠিক করে দিই- এই নিউজটা কীভাবে যাবে, কোন প্রতিবেদনটা আরও একটু যাচাই দরকার, কোথায় সতর্ক হতে হবে। নানা চ্যালেঞ্জ, নানা সীমাবদ্ধতা প্রতি পদে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভবিষ্যতে কী হবে, তা আমার হাতে নেই, কেউই বলতে পারে না। শুধু এটুকু বলতে পারি, যতদিন পারি, যে সুরে আজাদ বাজত, সেই সুরটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কখনো তাল কাটে, কখনো হাত কাঁপে। তবু চেষ্টাটা থামাইনি এখনো।
আজও কোনো কোনো রাতে ফোনের নোটিফিকেশনের শব্দে ধড়ফড়িয়ে তাকাই স্ক্রিনের দিকে, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়- এই বুঝি আজাদের নাম ভেসে উঠবে। ওঠে না। অন্য কারো মেসেজ, অন্য কোনো খবর। তবু সেই মুহূর্তটুকু, ওই এক লহমার প্রত্যাশা, প্রতিবার নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, সুরটা এখনো বাজছে আমার ভেতরে, শুধু বাদকটা বদলে গেছে।
আজাদ, তুই যেখানেই থাকিস, শান্তিতে থাক। তোর সুরটা আমি যতদূর পারি বাজিয়ে যাব। একুশে পত্রিকা আকাশের চাঁদের মতো উজ্জ্বল হোক- এই একটাই চাওয়া এখন আমার। কারণ এটা তো শুধু একটা পত্রিকা নয়, এটা তোরই সন্তান, তোরই প্রাণ। আর যতদিন এই প্রাণটা টিকে থাকবে, ততদিন তুইও থেকে যাবি, ঠিক এভাবেই, কোনো এক ভোররাতের আজানের সুরে মিশে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
