সত্যের সন্ধানে শেষ যাত্রা


অফিসে সারাদিন হজযাত্রী আর ওমরাহযাত্রীদের ভিড়। পাসপোর্ট, ভিসার কাগজপত্র, টিকিট- এসবের মধ্যেই কেটে যায় বছরের প্রায় প্রতিটা দিন। আজও তেমনই এক বিকেলে পুরনো একটা ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা ভিসা প্রসেসিংয়ের কাগজ, বছর তিনেক আগের। নামটা দেখে হাতটা থমকে গেল- আজাদ তালুকদার।

মানুষ মাত্রই মরণশীল, এই সত্যটা আমি প্রতিদিন কাউকে না কাউকে বোঝাই, নিজেকেও বোঝাই। তবু আজাদ তালুকদারের অকালে চলে যাওয়াটা মেনে নেওয়া আজও কষ্টসাধ্য। দেশ ও জাতির জন্য তাঁর মতো নির্ভীক, মানবিক, নিবেদিতপ্রাণ একজন সাংবাদিকের আরও অনেক দিন বেঁচে থাকা দরকার ছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার ফয়সালার ওপর তো কারও হাত নেই। তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

আজাদকে আমার নিজের পরিবারের একজন বলেই মনে হতো, আত্মার আত্মীয়। আমার স্নেহধন্য বড় ছেলে শরীফুল ইসলাম রুকন একুশে পত্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে, সেই সুবাদেই আজাদের সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল মোবাইল ফোনে। নানা পরামর্শ চাইতেন, শরিয়তের মাসলা-মাসায়েল জিজ্ঞেস করতেন। আমাকে মন থেকে মহব্বত করতেন, “চাচা” বলে ডাকতেন, প্রতিবার ফোন রাখার আগে দোয়া চাইতেন। তাঁর একটা তীব্র ইচ্ছা ছিল, আমার সাথে একসাথে পবিত্র হজে যাবেন। কিন্তু ক্যানসারের নির্মম থাবা তাঁকে সেই সুযোগ দিল না।

হজ না হোক, ওমরাহ তো হোক- এই ভাবনা থেকেই আজাদের ওমরাহ ভিসার প্রক্রিয়াটা আমি নিজ হাতে করে দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ। ইন্তেকালের অল্প কিছুদিন আগের কথা। তখন তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন, শরীরে ক্যানসারের কেমো চলছে, শরীরটা ভেঙে পড়েছে ভেতরে ভেতরে। সেই অবস্থাতেই ভারত থেকে সোজা পাড়ি জমাল পবিত্র মক্কার পথে। তারপর গেলেন রাসুলে করিম (সা.)-এর প্রিয় শহর মদিনায়। দুর্বল শরীর নিয়েও কাবার চারপাশে তাওয়াফ করলেন, রওজা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম জানালেন রাসুল (সা.)-কে। জীবনের শেষ বড় সফরটা যে একটা পবিত্রযাত্রা হয়ে উঠবে, এ যেন আল্লাহরই কোনো গোপন পরিকল্পনা।

আজাদ প্রায়ই আমাকে একটা কথা বলতেন, “চাচা, সাংবাদিকতা সত্যের সন্ধানে রোমাঞ্চকর একটি পেশা।” কথাটা যতবার ভাবি, ততবার মনে হয়, এই একটা বাক্যেই আজাদের গোটা জীবনের সারমর্ম লুকিয়ে আছে। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে নিছক পেশা ছিল না, ছিল দায়িত্ব, সাহস, অনুসন্ধিৎসা আর জনস্বার্থ রক্ষার এক অঙ্গীকার। সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্যের তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনার সেই লড়াই তিনি আজীবন চালিয়ে গেছেন। আজ একুশে পত্রিকা জনাব নজরুল কবির দীপুর নেতৃত্বে আজাদের সেই স্বপ্নই বাস্তবায়ন করে চলেছে।

আজ মনে হয়, আজাদের গোটা জীবনটাই ছিল এক ধরনের যাত্রা— সত্যের সন্ধানে এক অবিরাম অভিযাত্রা। প্রতিটা প্রতিবেদন ছিল সেই যাত্রার একেকটা ধাপ, লুকানো তথ্য খুঁজে বের করার একেকটা অভিযান। জাগতিক সত্যের সন্ধানে যে মানুষটা সারাজীবন ছুটে বেড়িয়েছে, শেষ জীবনে এসে তিনি ছুটে গেলেন চিরন্তন সত্যের সন্ধানে, আল্লাহর ঘরের দিকে। এই দুই যাত্রার মধ্যে আমি এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাই- দুটোই সাহসের যাত্রা, দুটোতেই নিজেকে সঁপে দিতে হয় কোনো এক বড় সত্যের কাছে।

২০২৩ সালের ২ আগস্ট, দুপুরে চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে জোহরের নামাজের পর আজাদের জানাজায় যে ঢল নেমেছিল মানুষের, তা আজও চোখে ভাসে। কত মানুষের চোখে সেদিন পানি দেখেছি, কত বোবা কান্না। পরে জামালখান সড়কে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে তাঁর সহযোদ্ধা সাংবাদিকরা তাঁর কর্মময় জীবনের নানা দিক নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন, নীরবে চোখের কোণ মুছলেন কেউ কেউ। সেই দ্বিতীয় জানাজাটা পড়ানোর দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। ইমামতি করতে করতে মনে হচ্ছিল, নিজের পরিবারেরই একজনকে যেন হারাচ্ছি।

তিন বছর পার হয়ে গেছে, তবু আজাদের স্মৃতি একুশে পত্রিকা পরিবারে এখনো সজীব। গত বছর, রমজানের আগে একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে আয়োজিত এক দোয়া ও ইফতার মাহফিলে আজাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত পরিচালনার সুযোগ হয়েছিল আমার। নজরুল কবির দীপু সাহেবের নেতৃত্বে সেই আয়োজনে সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী আর পরিবারের মানুষ একত্র হয়েছিলেন। মোনাজাতে হাত তুলে সেদিনও মনে হয়েছিল, আজাদ যেন কোথাও একটু দূরে বসে শুনছে আমাদের দোয়া।

জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের একটা পঙক্তির কথা বারবার মনে পড়ে আজাদকে নিয়ে ভাবতে গেলে- এমন এক জীবন গড়ে তোলা, যার মৃত্যুতে নিজে হাসিমুখে বিদায় নেওয়া যায়, অথচ সেই বিদায়ে গোটা পৃথিবী কেঁদে ওঠে। আজাদের জীবনটা যেন ঠিক সেই কথারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিল। ভয়কে জয় করে সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি, অনেকের ঈর্ষার শিকার হয়েও পথ থেকে সরেনি। রাষ্ট্র আর সমাজের কাছে এই মানুষটার অনেক পাওনা রয়ে গেল, যা হয়তো কোনোদিনই পুরোপুরি শোধ হবে না।

পরিশেষে বলি, আজাদ তালুকদারের এই তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে মহান আল্লাহ তায়ালার আলিশান দরবারে কায়মনোবাক্যে আমি আর আমার পরিবার-পরিজন তাঁর আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করি। আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁর জীবনের সকল দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন, আর মদিনায় যে রওজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি শেষবার সালাম জানিয়েছিলেন, সেই প্রিয় নবীর (সা.) সুপারিশে তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের চিরস্থায়ী মেহমান বানিয়ে নেন। আমিন।

লেখক : পরিচালক ও মুয়াল্লিম, বিসমিল্লাহ ওভারসীজ অ্যান্ড হজ সার্ভিস, চকবাজার, চট্টগ্রাম।