
বিকেল সাড়ে পাঁচটা। চট্টগ্রাম নগরীর প্যারেড কর্নারে তখন সূর্যের তেজ কমে আসছে। ব্যায়াম শেষে ঘর্মাক্ত শরীরে একটু জিরিয়ে নিয়েছেন মো. রাশেদুল ইসলাম। তারপর সোজা হাঁটা দিলেন ছোট্ট একটা ডিসপ্লে সেন্টারের দিকে। কাচের বাক্সের ভেতর সাজানো রঙিন ফলের টুকরো- আপেল, আঙুর, পেঁপে, তরমুজ- যেন নিজেই ডাকছে ক্রেতাদের।
রাশেদুল একটি বক্স হাতে নিয়ে বলেন, “আগে বাজার থেকে ফল কিনে বাসায় এনে ধুয়ে কেটে খেতে হতো। এখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে প্রস্তুত করা ফ্রুটস বক্স সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। এতে সময়ও বাঁচছে, আবার স্বাস্থ্যকর খাবারও নিশ্চিত হচ্ছে।”
রাশেদুলের মতো এমন অসংখ্য ক্রেতার আস্থা অর্জন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা এইচ. এম. সাইফুল ইসলাম। কৃত্রিম রং, ফ্লেভার আর অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমল পানীয়ের ভিড়ে যখন মানুষ ক্রমেই নিরাপদ ও প্রাকৃতিক খাবারের দিকে ঝুঁকছেন, ঠিক সেই সময়েই চট্টগ্রামে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি- নগরীতে প্রথমবারের মতো সরাসরি খাওয়ার উপযোগী “রেডি টু ইট ফ্রুটস বক্স।”
ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে স্বাস্থ্যকর খাবারের স্বপ্নযাত্রা
এমবিএ শেষ করে সাইফুল ইসলাম প্রথমে যোগ দেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। নিয়মিত বেতনের নিরাপদ চাকরি, স্থিতিশীল জীবন- চাইলে সেখানেই থিতু হতে পারতেন তিনি। কিন্তু মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল অন্য এক স্বপ্ন- মানুষের হাতে নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর খাবার তুলে দেওয়ার স্বপ্ন। সেই তাগিদ থেকেই একদিন গড়ে তোলেন “ফুড থেরাপি বক্স” নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।
“আমার লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়, মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা,” বলেন সাইফুল। “তাই প্রতিটি রেডি টু ইট ফ্রুটস বক্স তাজা, মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি আমরা শতভাগ ঘরে তৈরি, কালার ও কেমিক্যালমুক্ত জুস সরবরাহ করছি, যাতে সবাই নিশ্চিন্তে স্বাস্থ্যকর পানীয় উপভোগ করতে পারেন।”
শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। খুব ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। “শুরুতে অনেকেই বিষয়টি নতুন হিসেবে দেখেছেন,” স্মৃতিচারণ করে বলেন সাইফুল। কিন্তু ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে চিত্র। “এখন প্রতিদিন নতুন নতুন ক্রেতা আসছেন। তাদের সন্তুষ্টি, আস্থা ও ভালোবাসাই আমাকে আরও বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।”
প্যারেড কর্নারে প্রতি বিকেলে জমে ওঠে ভিড়
বিকেল গড়াতেই প্যারেড কর্নারের সেই ছোট্ট ডিসপ্লে সেন্টার হয়ে ওঠে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের এক মিলনমেলা। কেউ আসেন ব্যায়াম শেষে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি মেটাতে, কেউ পরিবারের জন্য কেনেন ফলের বক্স, আবার কারও খোঁজ থাকে বিশুদ্ধ, কেমিক্যালমুক্ত ঘরে তৈরি জুসের। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে যত্ন করে সাজানো ফল আর আকর্ষণীয় পরিবেশনা—সবকিছু মিলিয়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি সহজেই কেড়ে নেয় জায়গাটি।
নিয়মিত ক্রেতা তানজিলা আক্তারের কথায় স্পষ্ট হয় এই আস্থার কারণ। তিনি বলেন, “ঘরে তৈরি জুসের স্বাদ সত্যিই আলাদা। এতে কোনো কৃত্রিম রং বা অতিরিক্ত মিষ্টি নেই। তাই পরিবারের সদস্যদের জন্যও নিশ্চিন্তে কিনতে পারি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সোহেলের চোখে বিষয়টি নিছক ব্যবসার চেয়েও বেশি কিছু। “বর্তমান সময়ে মানুষ স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক সচেতন,” বলেন তিনি। “এমন উদ্যোগ শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গড়ে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।”
ছোট উদ্যোগ থেকে বড় স্বপ্নের পথে যাত্রা
একটি ছোট ডিসপ্লে সেন্টার দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন ধীরে ধীরে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ যত বাড়ছে, ততই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সাইফুল ইসলামের এই উদ্যোগ। নিরাপদ, পুষ্টিকর ও প্রাকৃতিক খাবারকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে বলে প্রত্যাশা তাঁর।
প্যারেড কর্নারের সেই ছোট্ট বাক্সগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়- এটি শুধু কিছু কাটা ফলের গল্প নয়। এটি একজন তরুণের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর নগরজীবনের স্বপ্ন দেখার, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প।
